একটা কৌতুক আছে না- বাঙালির নরকে কোনো পাহারাদার লাগবে না, কারণ কেউ দেয়াল টপকে পালাতে গেলে বাকিরা ঠিকই তার পা-দুটো চেপে ধরবে! বাঙালির এই ব্যাপারটাকে বলে ‘পরশ্রীকাতরতা’। খেয়াল করবেন— স্রেফ ঈর্ষা বললে সুবিচার হয় না কিন্তু বলতে হবে ‘পরশ্রীকাতরতা’। এহেন শব্দ পৃথিবীর আর কোনো ভাষায় আছে বলে জানা নেই।
আচ্ছা, কী হয় অন্যে ভালো থাকলে? নিজে খারাপ আছি— এটা নিয়ে থাকা যায়, কিন্তু অন্যে ভালো আছে— এ যেন সহ্যের সীমার বাইরে। এ কারণে দামী শার্ট গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে দেখে আমরা কিন্তু প্রশংসা করি না, বরং নিচের দিকে তাকিয়ে বলি- ‘খ্যাত একটা, কেমন চপ্পল পায়ে রাস্তায় বেরিয়েছে!’ একইভাবে মেয়েরাও কিন্তু অন্য মেয়ের ব্যাপারে প্রশংসা করে খুব কমই। একটা মজার ঘটনা শুনেছিলাম, এক নারী নিরন্তর চাইতেন ঘরের হারমোনিয়ামটা যেন ভেঙে যায়; কারণ তার ধারণা ছিল স্বামীর কাছে ঐ যন্ত্রটার মূল্য তার চেয়ে ঢের বেশি! আজব ব্যাপার- ঈর্ষার বশে এখন ভালবাসা নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে হবে একটা বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে?
এরকম মারাত্মক বিষক্রিয়া আছে বলেই ঈর্ষা নামের এই দানব কিন্তু অনেক রোগের জননী। সেটা ওসিডি থেকে শুরু করে সিজোফ্রেনিয়া পর্যন্ত। তবে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণাটা বোধহয় নিজের ভেতরের ক্রমাগত অশান্তি। আপনার ভেতরটা কিন্তু বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। মনের এই বিষ থেকে বাড়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষমতা। সহজ ব্যাপারকেও ঘুরিয়ে দেখতে শুরু করেন আপনি। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘ডিস্ওরিয়েন্টেশন অব রিয়েলিটি’। একারণে শেক্সপিয়ার ঈর্ষার নাম দিয়েছিলেন ‘গ্রীন আইড্ মনস্টার’, যে দানব সবকিছুর উপর বিষাদের সবুজ পর্দা টেনে দেয়।
এই সমস্যাটার কিন্তু অনেক রকমফের আছে। মূল কারণগুলো হলো: প্রথমত, নিজের ভেতরের চাওয়া; আর দ্বিতীয়ত, সমাজের চাপ। সমাজের চাপটা হলো বাইরের ব্যাপার— সবাইকে প্রথম হতে হবে, সব ব্র্যান্ডেড জিনিস থাকতে হবে এবং অন্য সকলের আগে আমাকেই সেটা পেতে হবে— এমনটা কিন্তু আজকাল একরকম ‘রীতি’ হয়ে গেছে। এটা থেকে বেড়িয়ে আসাটা খুব কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সহজ সমাধান হচ্ছে সৎসঙ্গে থাকা— যারা এই অনবরত বৈষয়িক প্রতিযোগিতার পক্ষে নন তাদের সঙ্গে থাকা। আর নিজের ভেতরের স্পৃহাটা হলো আপনার মানসিকতা। যেরকম কেউ কেউ আছেন যারা খুব খুঁতখুঁতে হোন— সবকিছু বাছাই করে চলেন; একদম সেরাটা না হলে তাদের মন ভরে না। এর পেছনের ব্যাখ্যাটাও কিন্তু অন্যকে পেছনে ফেলারই নামান্তর। খুশির খবর হলো এই মানসিকতাটা আপনার এগিয়ে যাওয়ার পথে বড়রকমের সহায়ক হতে পারে যদি স্রেফ এর ধরনটা আপনি পাল্টে দিতে পারেন। এই ঈর্ষাটাই তখন হয়ে যাবে ভালো কাজের প্রভাবক; যেরকম কাজে সাফল্য বা পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতা। সেক্ষেত্রেও আপনি অন্যকে পেছনে ফেলতে চাইছেন, কিন্তু তখন ব্যাপারটা আপনার জন্যে ধ্বংসাত্মক না হয়ে সহায়ক হবে।
তাই বন্ধুরা, কুচিন্তার উপর লাগাম দিন। অন্যের ভালোতে না জ্বলে ‘নিজের শক্তিতে জ্বলে উঠুন’। প্রতিযোগিতা করুন ‘গতকালের আমি’র সঙ্গে ‘আজকের আমি’র। দেখবেন ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছেন আপনি। আর তা না করে অন্যের শ্রী দেখে কাতর হোন বা স্ত্রী দেখে— ভুগবেন কিন্তু আপনি নিজেই।
প্রথমত, অগ্রাধিকার ঠিক করুন। আপনি যদি আসল সমস্যা ও তুচ্ছ সমস্যার মধ্যে পার্থক্য করতে না পারেন তাহলে আপনি টেনশনে আক্রান্ত হবেন। এটা যেরকম জীবনের খুব বড় বড় বিষয়গুলোর জন্যে সত্যি, তেমনি নিত্যদিনের টুকিটাকি কাজের বেলায়ও সত্যি। নিত্যদিনের আবশ্যক কাজের বাইরে যদি হঠাৎ কিছু এসে পড়ে তাহলে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সে কাজটা আদৌ করবেন কিনা। আবার বহুদিন ধরে জমে আছে এমন কাজগুলো শেষ করার জন্যে ছুটির দিন বেছে নিতে পারেন, অথবা প্রতিদিন একটু একটু করেও শেষ করে ফেলতে পারেন। জরুরি হলো সেগুলো মনে রাখা। একটা কাগজে ১-২-৩- দিয়ে লিস্ট করে ফেলুন এবং সাথে রাখুন। দেখবেন ভুল হবে না।
দ্বিতীয়ত, আবেগ প্রকাশ পেতে দিন। রাগ হলে দেয়ালে জোরে ঘুষি মারলে যেমন আরামবোধ হবে, তেমনি মনের বাড়ি গিয়ে ইচ্ছেমতো চেঁচালেও শান্তি পাবেন। তবে হ্যাঁ, ব্যক্তি কারো উপর রাগ ঝাড়া সবসময়ই নিজের জন্যে ক্ষতিকর। সমস্যা সমাধানে আগে মাথা ঠান্ডা করুন, এরপর সময় নিয়ে তাকে কড়া একটা ধমক দিয়ে দিন। আর যদি কাঁদতে ইচ্ছে করে তবে হাউ-মাউ করে কাঁদুন। ছেলেদের (বা ‘পুরুষদের’) জন্য বলি কান্নাকে মেয়েলি ভাববেন না। কান্না নার্ভাস সিস্টেমকে টেনশনমুক্ত করে। আবার একই কথা হাসির বেলায়ও প্রযোজ্য। তাই প্রতিদিন খুব করে হাসুন, হাসির নতুন নতুন উপলক্ষ সৃষ্টি করুন।
টেনশনমুক্তির আরেকটা উপায় হলো ‘না’ বলতে পারা। যত আপনি অন্যকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করবেন, লোকে কী ভাবল—সেটাকে গুরুত্ব দিবেন তত আপনি টেনশনে ভুগবেন। তাই নিজের প্রয়োজন বা ইচ্ছের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য রাখবেন। বিনয়ের সাথে যখন ‘না’ বলতে পারবেন, দেখবেন আপনি অনেক স্বস্তি বোধ করছেন। যেটা করবেন না সেটাতে প্রথমেই না বলুন; করব-করব বলে যত দীর্ঘসূত্রিতা করবেন তত আপনার অস্থিরতা বাড়বে।
আর, যত জীবনের সাথে মমতাকে যুক্ত করতে পারবেন তত আপনি ভালো থাকতে পারবেন। এ মমতার প্রকাশ যে কোনোভাবে হতে পারে। বন্ধুর সঙ্গে খোশগল্প বা প্রিয়জনের সঙ্গে একটু হাসাহাসি আপনার দিনটাকে অনেকখানি চাঙ্গা করে দিতে পারে। বাবা-মা হিসেবে বাইরে বেরোনোর আগে বা রাতে ঘুমাতে যাবার সময় ছেলেমেয়ের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিন বা আদর করে দিন। দেখবেন ভালবাসার এ প্রকাশ আপনার মনকে বহুগুণে পরিতৃপ্ত করছে।
সবশেষে বলব টেনশন ছাড়তে চাইবেন আর মেডিটেশন করবেন না— এটা হবে না। টিভি বা সিনেমার পর্দার সামনে বসলেই আপনার শরীর-মন শিথিল হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং অভিজ্ঞতা বলে এর উল্টোটাই ঘটে বেশি। তাই প্রতিদিন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় শিথিলায়ন করুন। কল্পনাকে আপনার চিন্তা ও দেহের উপর কর্তৃত্ব করতে দিন। দরজা বন্ধ করে আধ ঘণ্টার জন্যে হাত-পা ছেড়ে শুয়ে পড়ুন। লম্বা দম নিতে নিতে শরীরকে শিথিল হয়ে যেতে দিন। গভীর ঘুমের মতো ঝরঝরে হয়ে উঠবেন।
📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের
ইনস্টাগ্রাম
ভিজিট করুন।