রংপুর বিভাগ

গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল পল্লিতে পানির তীব্র সংকট

গাইবান্ধার আদিবাসী সাঁওতাল পল্লিতে পানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। মাটি খুঁড়ে গর্ত করে অতিরিক্ত পাইপ বসিয়েও পানি পাওয় যাচ্ছে না। খাবার জন্য ও নিত্য ব্যবহারের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে সাঁওতাল নারী-পুরুষের।

পানির জন্য সাঁওতাল পল্লিতে এই শুষ্ক মৌসুমে হাহাকার অবস্থার সৃষ্টি হলেও জনপ্রতিনিধি অথবা সরকারি কোনো দপ্তর এগিয়ে না আসায় সাঁওতালরা ক্ষুব্ধ।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রাজাহার, কাটাবাড়ি, গুমানীগঞ্জ, সাপমারা, শাখাহার, কামদিয়াসহ ৬ ইউনিয়নের সাঁওতাল পল্লির নলকূপে পানি উঠছে না। মাদারপুর, জয়পুরপাড়া, হরিনমারি, চামগাড়ি, সুখানপুকুর, কুয়ামারা, তিনতালেরগাছ, গাওচুলকা, লোটাগাড়ি, সিংটাজুড়ি, গোয়ালপাড়াসহ অর্ধশত গ্রামে অন্তত আড়াই হাজার পরিবারের টিউবওয়েলে পানি না ওঠায় বেকায়দায় পড়েছেন সাঁওতালরা। এসব এলাকার অধিকাংশই সাঁওতাল নারীপুরুষ পরিবারের বসবাস।

বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকায় পানি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে সাঁওতাল পল্লিতে পানি সংকট তীব্র হয়ে দাঁড়ায়। টিউবওয়েল নির্ভর বাড়িগুলোর টিউবওয়েল থেকে কয়েক দিন ধরে আর পানি উঠছে না। অনেকেই মাটিতে ২০ ফুট গর্ত খুঁড়ে টিউবওয়েলের অতিরিক্ত পাইপ বসিয়ে পানি উত্তোলনের চেষ্টা করছেন; কিন্তু পানি উঠছে না। যাদের অতিরিক্ত পাইপ বসানোর আর্থিক সঙ্গতি নেই, তারা পড়েছেন আরও বেকায়দায়।

সাঁওতাল নারী-পুরুষরা পানি সংকট মেটাতে দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করছেন।

সাঁওতাল নেতা বিমল বেশরা জানান, আমরা তো মানুষ না। সাঁওতালদের দিকে চেয়ারম্যান-মেম্বার, এমনকি স্থানীয় প্রশাসনও খোঁজখবর নেয় না। হাজার হাজার সাঁওতাল পানির অভাবে খোলা মাঠে পাম্পে গিয়ে গোসল করছেন।

তিনি বলেন, রান্না, গোসল, মাছ ধোয়াসহ নিত্য ব্যবহার্য কাজ করতে হচ্ছে জমিতে বোরো ক্ষেতের সেচের পানি দিয়ে। খোলা মাঠে জমি সেচের পানি দিয়ে নারী ও পুরুষরা গোসল করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে কয়েক মাইল দূর থেকে। পায়খানা, প্রস্রাব করতে যে পানি ব্যয় করতে হয় সে রকম পানিও ঘরে থাকে না। দূর থেকে কষ্ট করে খাবার পানি থেকে অন্যসব কাজ সারতে বাধ্য হচ্ছি আমরা।

সাঁওতাল নেতা বার্নাভাস টুডু বলেন, প্রতি বছর আমাদের খাবার মতো পানি ঘরে থাকে না, টিউবওয়েলেও পানি ওঠে না। সেই কথা স্থানীয় প্রশাসন ও চেয়ারম্যান মেম্বারও জানে; কিন্তু তারা সাঁওতালদের মানুষ মনে করে না। সাঁওতাল মা-বোনরা মাঠে গিয়ে বোরোখেতের পানিতে গিয়ে মাছ ধুয়ে রান্না করতে হচ্ছে। সারা দিন কাজের পর এই গরমে তারা মাঠে কাজের পর বিকালে গোসল করতে হয় জঙ্গলের আড়ালে অথবা জমির আইলে সেচের পানি থেকে। তবে যাদের সামর্থ্য আছে তারা সাব মার্সিবল পাম্প বসিয়ে পানি ব্যবহার করছেন। এমন বিত্তবান শতকরা দুজনও নাই। কাজেই ৬ ইউনিয়নের প্রায় আড়াই হাজার সাঁওতাল পরিবারকে জীবন ধারণের জন্য মাইলের পরম মাইল পায়ে হেটে গিয়ে খাবার পানি আনতে হচ্ছে।

সাঁওতাল নেত্রী সুচিত্রা মুর্মু জানান, মানবাধিকার লঙ্ঘন করে দীর্ঘদিন ধরে সাঁওতালদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। জীবন বাঁচানোর জন্য যে টুকু পানির প্রয়োজন সেটুকু পানির গ্যারান্টিও সরকার দায়িত্ব নিতে পারছে না।

বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির নেতা ও সাঁওতাল নেতা ডা. ফিলিমন বাসকে জানান, আমরা তো চিরদিন অবহেলিত হয়েছি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাঁওতাল পল্লিতে অগ্নিসংযোগ করে বাড়িঘর পুড়িয়ে গুলি করে তিন সাঁওতালকে হত্যা করা হলো সেই বিচার আমরা এখনো পাইনি। সাঁওতাল অধ্যুষিত ৬ ইউনিয়নের খ্রিস্টান মিশনসহ বাড়ির টিউবওয়েলগুলো থেকে পানি উঠছে না। পানির জন্য হাজার হাজার পরিবার হাহাকার করছে কিন্তু কেউ খোঁজ নিতেও আসে না।

গাইবান্ধা জনস্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সায়হান আলী জানান, তিনি খোঁজ নিয়ে ঘটনার সত্যতা খুঁজে পেয়েছেন। শুষ্ক মৌসুমে ৬ ইউনিয়নের সাঁওতাল পল্লিতে পানি সংকট দেখা দেয়। এজন্য তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি অবহিত করেছেন। আশা করি নির্দেশনা পেলে পানি সংকট দূরীকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel