সুদানে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় ১৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। চিকিৎসাকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের মধ্যে ড্রোনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বাড়ছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানী খার্তুমে ড্রোন হামলায় তিন শিশু নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইমার্জেন্সি লইয়ার্স নামের একটি সংগঠন। সুদানের গৃহযুদ্ধে বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা পর্যবেক্ষণ করে সংগঠনটি। এ ছাড়া শুক্রবার থেকে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলগুলোতে হামলায় ১৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
২০২৩ সাল থেকে সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে সংঘাত চলছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উভয় পক্ষের ড্রোন হামলা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনাটি ঘটে রোববার সন্ধ্যায় (১৮ অক্টোবর) পশ্চিম কোরদোফান রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আল-দিবাব শহরে। এলাকাটি আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারের দিন শেষে বাড়ি ফেরার জন্য যানবাহনের অপেক্ষায় একটি পরিবহনকেন্দ্রে জড়ো হয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। সেখানে ড্রোন হামলা চালানো হলে অন্তত ৮০ জন নিহত হন।
এ ঘটনায় আহত ৪৭ জনকে কাছের আল-মুজলাদ শহরে নেওয়া হয়। চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে আরও ৩০ জন পরে মারা যান।
হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে আরএসএফের স্বঘোষিত প্রশাসন তাসিস এবং ইমার্জেন্সি লইয়ার্স। তবে এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সুদানের পূর্বাঞ্চলে গেদারেফ রাজ্যের আতবারা ও সেটিট বাঁধ লক্ষ্য করে আরএসএফের কয়েকটি ড্রোন হামলার চেষ্টা চালায় বলে জানিয়েছে দেশটির একটি সামরিক সূত্র। রোববার এসব ড্রোন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
বাঁধ দুটি রাজধানী খার্তুম থেকে প্রায় ৪২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে আরএসএফের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সোমবার ভোরে দক্ষিণ দারফুর রাজ্যের রাজধানী নিয়ালায় আরেকটি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। শহরটি আরএসএফের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
চিকিৎসা ও আরএসএফ-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আরএসএফের সাতজন কর্মকর্তা রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৩ জন।
শুক্রবার সুদানের ব্লু নাইল প্রদেশে ইথিওপিয়া সীমান্তের কাছে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি সমাবেশে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে ৪১ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইমার্জেন্সি লইয়ার্স।
সংগঠনটি এ ঘটনাকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করে হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
সুদানে বেসামরিক মানুষের ওপর ধারাবাহিক প্রাণঘাতী ড্রোন হামলার ঘটনায় সোমবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশজুড়ে অব্যাহত প্রাণঘাতী ড্রোন হামলায় আমরা উদ্বিগ্ন। এসব হামলায় শিশুসহ বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবাব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।’
সুদানের বর্তমান যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। দেশটির সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং আরএসএফপ্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালোর (হেমেদতি) মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও আধাসামরিক বাহিনীকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করার পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধ থেকে সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
যুদ্ধের চতুর্থ বছরে গড়ানো এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি)। তবে সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর ধারণা, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
জাতিসংঘের হিসাবে, সংঘাতের কারণে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে সুদানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সুদানে ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষের জরুরি খাদ্যসহায়তা প্রয়োজন। তাঁদের মধ্যে ১ কোটি ৭৩ লাখ শিশু। এ ছাড়া আনুমানিক ৮ লাখ ২৫ হাজার শিশু গুরুতর তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে সুদানে মানবিক যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ জোরদার করার এবং দেশটির ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
তবে নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের প্রস্তাবে চীন ও রাশিয়া আপত্তি জানিয়েছে। ফলে চলমান সংঘাত বন্ধ এবং বেসামরিক মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের
ইনস্টাগ্রাম
ভিজিট করুন।