রাজশাহী

স্মৃতি ফিরিয়ে ৫৫ বছর পর কড়কড়িয়া মন্দিরে চণ্ডীপাঠ ও ঢাকের বোল

শেষবার যখন পূজার ঢাকের বাদ্য বেজেছিল, তখন দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এরপর ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলেও নানা আর্থসামাজিক প্রতিকূলতায় কেটে গেছে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক। অবশেষে দীর্ঘ ৫৫ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার কড়কড়িয়া গ্রামে আবারও প্রতিধ্বনিত হলো ঢাক-কাঁসরের তাল, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের উলুধ্বনি। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো এই গ্রামে শারদীয় দুর্গোৎসবের বর্ণাঢ্য আয়োজন ফিরে আসায় পুরো এলাকায় বইছে সীমাহীন আনন্দের জোয়ার।

নিয়ামতপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের কড়কড়িয়া (কর্মকারপাড়া) সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে নতুন উদ্যমে শুরু হওয়া এই পূজা ঘিরে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। শনিবার ১৭ অক্টোবর মহাসপ্তমীর বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দির প্রাঙ্গণে ঢোকার মুখে নির্মাণ করা হয়েছে নান্দনিক তোরণ। বর্ণিল আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে পুরো মন্দির চত্বর। দীর্ঘ বছর পর নিজ গ্রামে প্রতিমা বিসর্জনের পূর্ব পর্যন্ত দেবীর দর্শন পাওয়ার সুযোগে ভক্ত-পূণ্যার্থীদের মাঝে চরম উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা প্রতিমা দর্শন করছেন, মোবাইল ফোনে স্মৃতি বন্দি করছেন এবং আয়োজকদের পক্ষ থেকে সবার মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে চরণামৃত ও মহাপ্রসাদ।

গ্রামের ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা সুশিল কর্মকার অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যখন এই গ্রামে দুর্গাপূজা হতো, তখন গ্রামটিতে মাত্র ১৬ থেকে ১৭টি পরিবারের বসতি ছিল। সেই সময়ে আশপাশের বহু গ্রাম থেকে শত শত মানুষ আসতেন প্রতিমা দর্শনে। পূজা উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে বসত আলকাপের গানের জমজমাট আসর। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক অসচ্ছলতাসহ নানা সামাজিক বাস্তবতায় এখানে আর পূজার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে অর্ধশতক পর নিজ উঠোনে আবারও দুর্গাপূজার উৎসব দেখতে পেয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি নরেন কর্মকার জানান, পূর্বপুরুষদের কাছে দেশ স্বাধীনের আগের সেই জাঁকজমকপূর্ণ পূজার গল্প শুনেই তাঁরা বড় হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের মাঝে ঐতিহ্যের ধারা ফিরিয়ে আনতে এবং গ্রামে উৎসবের আবহ তৈরি করতে গ্রামবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগে এ বছর নতুন করে এই পূজার আয়োজন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের শূন্যতা কাটিয়ে এই আয়োজনকে সফল ও উৎসবমুখর করতে যুবসমাজ থেকে শুরু করে প্রবীণেরা একযোগে দিন-রাত কাজ করছেন।

পাশের ভাবিচা গ্রাম থেকে পূজা দেখতে আসা শ্যামল চন্দ্র সাহা স্মৃতিচারণ করে বলেন, তাঁর বাবা স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে এই কড়কড়িয়া মন্দিরে পূজার প্রধান জোগাড়ু বা পুরোহিতের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। বাবার স্মৃতিবিজড়িত সেই পূজামণ্ডপ আবার জীবন্ত হয়ে ওঠায় তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। এদিকে গ্রামের গৃহবধূ আদরী কর্মকার জানান, প্রতিবছর পূজার আনন্দ উপভোগ করতে তাঁদের দূরবর্তী বিভিন্ন গ্রামে যেতে হতো এবং রাতে আরতি দেখার সুযোগ থাকত না। এবার ঘরের দরজায় পূজার আয়োজন হওয়ায় নারীদের মধ্যে আনন্দ সবচেয়ে বেশি।

নিয়ামতপুর উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি ভীম চন্দ্র বর্মণ জানান, নিয়ামতপুর উপজেলায় এ বছর মোট ৫৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে কড়কড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে ৫৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া নতুন এই আয়োজন গ্রামীণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় উদ্দীপনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা সম্পন্ন করার সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...