লাইফস্টাইল

প্রতিদিন ১০ হাজার কদম হাটতে হবে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই

প্রতিদিন ১০ হাজার কদম হাঁটার ধারণা বেশ প্রচলিত। তবে স্বাস্থ্যের উপকার পেতে এতটা হাঁটা বাধ্যতামূলক নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার কদম হাঁটলেও অকালমৃত্যু ও বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। শুধু হাঁটার পরিমাণ নয়, হাঁটার গতিও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।

gnewsদৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিসের নামে প্রচলিত একটি উক্তি হলো, ‘হাঁটাই মানুষের সর্বোত্তম ওষুধ।’ কথাটি সত্যিই তার বলা কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে হাঁটার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বেশ কিছু ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

হাঁটা এমন একটি ব্যায়াম, যার জন্য বিশেষ যন্ত্রপাতি বা অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয় না। অধিকাংশ মানুষ সহজেই দৈনন্দিন জীবনে হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। কিন্তু প্রতিদিন কত কদম হাঁটা উচিত, আর কত দ্রুত হাঁটলে বেশি উপকার পাওয়া যায়?

প্রতিদিন ১০ হাজার কদম হাঁটার ধারণাটি মূলত কোনো চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা থেকে আসেনি। ১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিকের আগে জাপানে পদক্ষেপ গণনার একটি যন্ত্রের প্রচারণার মাধ্যমে এই ধারণা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জাপানি কাঞ্জি লিপিতে ১০ হাজার সংখ্যাটির আকৃতিও হাঁটতে থাকা মানুষের মতো মনে হয়। সংখ্যাটির জনপ্রিয়তার পেছনে এটিও একটি কারণ বলে মনে করা হয়।

তবে প্রতিদিন ১০ হাজার কদম হাঁটার লক্ষ্য রাখতেই হবে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

২০২৫ সালে ‘ল্যানসেট পাবলিক হেলথ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় হাঁটার পরিমাণের সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত ফলাফলের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হাঁটাসংক্রান্ত ৫৭টি গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করেন গবেষকেরা।

গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিদিন দুই হাজার কদম হাঁটার তুলনায় সাত হাজার কদম হাঁটলে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি ৪৭ শতাংশ কমার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। হৃদ্‌রোগ ও রক্তনালির রোগের ঝুঁকি কমার হার ২৫ শতাংশ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমার হার ১৪ শতাংশ।

হাঁটার পরিমাণ সামান্য বাড়ালেও উপকার পাওয়া যায়। প্রতিদিন দুই হাজারের পরিবর্তে চার হাজার কদম হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুললে দীর্ঘ মেয়াদে মৃত্যুর ঝুঁকি ৩৬ শতাংশ কমার সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তবে হাঁটার পরিমাণ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি উপকার পাওয়ার হার একপর্যায়ে কমে আসে। গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রোগতত্ত্ববিদ মেলোডি ডিং বলেন, অধিকাংশ স্বাস্থ্যগত ফলাফলের ক্ষেত্রেই প্রতিদিন সাত হাজার কদম হাঁটার পর অতিরিক্ত হাঁটার ফলে বাড়তি উপকারের হার কমতে দেখা যায়।

অর্থাৎ, সাত হাজারের বেশি কদম হাঁটলেও উপকার পাওয়া যায়। তবে সাত হাজারের পরিবর্তে ১০ হাজার কদম হাঁটলে মৃত্যুর ঝুঁকি কমার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা তুলনামূলকভাবে সামান্য হতে পারে।

শুধু কদম নয়, হাঁটার গতিও গুরুত্বপূর্ণ

প্রতিদিন কত কদম হাঁটা হচ্ছে, সেটিই স্বাস্থ্যের একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। হাঁটার গতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা সাধারণত প্রতি মিনিটে নেওয়া পদক্ষেপের সংখ্যা দিয়ে হাঁটার গতি পরিমাপ করেন।

মেলোডি ডিংয়ের মতে, হাঁটার জন্য আদর্শ গতি কত হওয়া উচিত, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে ক্রীড়াবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, শারীরিক কার্যকলাপের তীব্রতা বাড়লে স্বাস্থ্যগত উপকারও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, হাঁটার সময় হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে গেলে বা কিছুটা হাঁপিয়ে উঠলে তা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এমানুয়েল স্তামাতাকিসের গবেষণাতেও হাঁটার গতি ও পরিমাণের গুরুত্ব উঠে এসেছে।

গত সেপ্টেম্বরে ‘ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় স্তামাতাকিস ও তার সহকর্মীরা হাঁটার পরিমাণ এবং গতির সম্মিলিত প্রভাব বিশ্লেষণ করেন। যুক্তরাজ্যের একটি বড় গবেষণাভান্ডারের তথ্য ব্যবহার করে ৬৪ হাজার ৭৪৩ জনের স্বাস্থ্যগত অবস্থা প্রায় আট বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, দ্রুতগতিতে হাঁটার সঙ্গে মৃত্যুর ঝুঁকি কমার সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিদিন শূন্য থেকে পাঁচ হাজার দ্রুত পদক্ষেপে হাঁটার সঙ্গে যে পরিমাণ ঝুঁকি হ্রাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে, তা পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে সাত হাজার কদম ধীরে হাঁটার ক্ষেত্রেও প্রায় একই রকম।

তবে হাঁটার গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও একপর্যায়ে বাড়তি উপকারের হার কমে আসে।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, প্রতিদিন সাড়ে সাত হাজার থেকে ১০ হাজার কদম হাঁটার লক্ষ্য রাখা এবং এর মধ্যে কিছু সময় প্রতি মিনিটে প্রায় ১০০টি পদক্ষেপের গতিতে হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য কার্যকর হতে পারে।

হাঁটার সুযোগ কম হলে কী করবেন

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো পরিমাণ হাঁটাই একেবারেই হাঁটা না করার চেয়ে ভালো। তাই ব্যস্ততার কারণে প্রতিদিন বেশি সময় হাঁটার সুযোগ না পেলেও হাঁটার গতি বাড়িয়ে উপকার পাওয়া যেতে পারে।

স্তামাতাকিসের পরামর্শ, হাঁটার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকলে দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই সেই সুযোগ তৈরি করা উচিত।

যেমন, সুপারশপের প্রবেশপথের একেবারে কাছে গাড়ি না রেখে কিছুটা দূরে পার্ক করা যেতে পারে। এরপর বাকি পথ দ্রুতগতিতে হেঁটে যাওয়া যায়। এভাবে আলাদা করে ব্যায়ামের সময় বের না করেও দৈনন্দিন জীবনে হাঁটার পরিমাণ ও গতি বাড়ানো সম্ভব।

সব মিলিয়ে, প্রতিদিন ১০ হাজার কদম হাঁটতে না পারলেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা, ধীরে ধীরে কদমের সংখ্যা বাড়ানো এবং সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটার গতি বাড়ানোই স্বাস্থ্যের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...