দিনাজপুর

‘সু-খবর, সু-খবর, সু-খবর’ সুখবরে অতিষ্ঠ খানসামাবাসী

স্টাফ রিপোর্টার: ‘সু-খবর, সু-খবর, সু-খবর’—মাইকের এমন উচ্চ শব্দে প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার অনেক বাসিন্দার। কখনো বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পাওয়ার ঘোষণা; কখনো কোচিং সেন্টারে ভর্তি, দোকান-হোটেল ও শোরুম উদ্বোধনের প্রচার। এর সঙ্গে রয়েছে কম দামে মুরগি, গরুর মাংস, মোবাইল সিমসহ নানা পণ্যের বিজ্ঞাপন। সকাল থেকে শুরু হয়ে কোথাও রাত ৮টা, আবার কোথাও রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এই মাইকিং। প্রতিদিনের এমন কোলাহলে স্বস্তি হারাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

উপজেলার আঞ্চলিক মহাসড়ক ধরে মাইক লাগানো ভ্যান ও ইজিবাইক চলার সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে বিজ্ঞাপনের শব্দ। ঘরের ভেতরে থেকেও তা থেকে রেহাই মেলে না অনেকের। শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, অসুস্থ ও বয়স্ক ব্যক্তিদের বিশ্রামেও বিঘ্ন ঘটে। আর দোকানে বসে ব্যবসা করতে গিয়ে ক্রেতার কথাও ঠিকমতো শুনতে পান না অনেকে। প্রচারের এই আয়োজন কারও কাছে ব্যবসা বাড়ানোর কৌশল হলেও সাধারণ মানুষের জন্য তা প্রতিদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোর হলেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং শুরু হয়। বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসকদের প্রচার, কোচিং সেন্টারে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি এবং ভ্রাম্যমাণ দোকানে পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারে ব্যবহার করা হয় উচ্চ শব্দের মাইক। কখন, কতটা শব্দে প্রচার চালানো হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

মাইকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ কাজের জন্য তাঁদের দৈনিক আটশত থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভ্যান ও ইজিবাইকে একাধিক মাইক লাগিয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালান তাঁরা। কোচিং সেন্টার ও শোরুমের বিজ্ঞাপনেও ব্যবহার করা হয় উচ্চ শব্দের মাইক।

শিক্ষার্থী ইমন ইসলাম বলেন, ‘উচ্চ শব্দে মাইকিংয়ের কারণে বাসায় পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় এমন শব্দ খুবই বিরক্তিকর। প্রচারের জন্য নির্দিষ্ট সময় ও শব্দের মাত্রা মেনে চলা উচিত। এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ চাই।’

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। চা বিক্রেতা রকিবুল ইসলাম রকি বলেন, ‘সকাল থেকে রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে মাইকিং চলায় দোকানে বসে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে সমস্যা হয়, অনেক সময় অর্ডারও ঠিকমতো শুনতে পাই না। প্রচারের নামে এভাবে শব্দ সৃষ্টি না করে নির্দিষ্ট সময় ও সহনীয় মাত্রায় মাইকিং করা উচিত।’

মোটরসাইকেল পার্টস বিক্রেতা শাকিল বলেন, ‘দোকানে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলা ও পণ্যের বিষয়ে বোঝাতে গিয়ে মাইকের উচ্চ শব্দে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এমন শব্দ চলায় কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যবসার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে মাইকিংয়ের শব্দ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের নজরদারি প্রয়োজন।’

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি বিধিমালা থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চারপাশের ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাকে নীরব এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব এলাকায় দিনের সর্বোচ্চ শব্দমাত্রা দিনে ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। জনপরিসরে মাইক ও লাউডস্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ ও শাস্তির বিধান রয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষক আব্দুল ওহাব বলেন, ‘উচ্চ শব্দে মাইকিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায় পড়ার সময় এমন প্রচার তাদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়। প্রচার-প্রচারণা চালানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় ও শব্দের মাত্রা মেনে চলা উচিত। এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. ফেরদৌস আলম রাসেল বলেন, “সাধারণত মানুষের শ্রবণের জন্য ৪৫ ডেসিবেল শব্দ সহনীয় মাত্রা। তবে তা ৬৫ থেকে ৭০ ডেসিবেল অতিক্রম করলে ক্ষতিকর হতে পারে। ১৩০ ডেসিবেল শব্দে স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি হারানোর আশঙ্কা থাকে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত যে হারে মাইকিং করা হয়, তাতে শব্দের মাত্রা প্রায়ই ৭০ ডেসিবেলের ওপরে থাকে, যা শিশুদের জন্য খুবই ক্ষতিকর।”

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অয়ন ফারহান শামস বলেন, “শব্দদূষণের বিষয়টি আমাকে জানিয়ে খুব ভালো করেছেন। এ বিষয়ে ইউএনও স্যারের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, ‘শব্দদূষণ রোধে সংশ্লিষ্টদের লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হবে। কেউ শব্দদূষণ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি বাড়ানো কিংবা চিকিৎসাসেবার তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রচার-প্রচারণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই প্রচার যেন অন্যের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। খানসামার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, শুধু নির্দেশনা নয়, নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে মাইকিংয়ের সময় ও শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ‘সুখবরের’ নামে চলা এই কোলাহল কমিয়ে জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই তাঁদের দাবি।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...