দিনাজপুর প্রতিবেদকঃ দিনপঞ্জির হিসাবে শীতকাল শুরু না হলেও প্রকৃতিতে বইতে শুরু করেছে শীতের আগমনী বার্তা। এরই প্রভাবে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার গ্রামাঞ্চলে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। বছরের অন্য সময় কাজের চাপ কম থাকলেও শীত মৌসুমে খেজুরের গুড় তৈরি করেই জীবিকা নির্বাহ করেন তাঁরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন গাছিরা। পরে মাটির তৈরি বড় চুলায় কড়াই বসিয়ে সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে সুস্বাদু খেজুরের গুড়। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি খেজুর গাছে ঝুলছে মাটির হাঁড়ি। ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছ থেকে রস ভর্তি হাঁড়ি নামিয়ে তা বড় কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে গুড়, পাটালি ও লালি। পরে এসব পণ্য চলে যাচ্ছে বাজারে।
গুড় তৈরির কাজে ব্যস্ত গাছি মো. হযরত আলী জানান, তাঁরা ছয়জনই রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলার বাসিন্দা। গত চার বছর ধরে শীত মৌসুমে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর এলাকায় এসে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করছেন। এ বছর কার্তিক মাসেই তাঁরা গুড় তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
হযরত আলী জানান, প্রতিবছর নবাবগঞ্জ এলাকার গাছমালিকদের কাছ থেকে চুক্তিতে খেজুরগাছ কিনে নেন তাঁরা। এবার ২৩২টি গাছ থেকে প্রতিদিন সকালে রস সংগ্রহ করছেন। দাউদপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতেও একইভাবে খেজুরের গুড় তৈরির কাজ চলছে।
হযরত আলী (৪৫), জাকির হোসেন (৪২), জাহিরুল হক (৩৮), রফিক উদ্দিন (৪৪), মানিক হাসান (৪৫) ও হাজির আলী (৩৮)—এই ছয়জন একসঙ্গে গুড় তৈরির কাজে এসেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। বছরের পাঁচ মাস দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খেজুরের গুড় তৈরি করেন। বাকি সময় নিজ এলাকায় থেকে অন্য কাজ করেন।
হযরত আলী বলেন, ‘বাপ-দাদার কাছ থেকে এই কাজ শিখেছি। দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে চুক্তিতে খেজুরগাছ নিয়ে রস নামিয়ে গুড় তৈরি করে বিক্রি করি। আশ্বিন মাসের ২২ তারিখে এবার দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় এসেছি। খেজুরের গুড় তৈরি করাই আমাদের মূল ব্যবসা। বাকি সময় আমার এলাকায় অন্য ছোট ব্যবসা বা কৃষিকাজ করে থাকি।’
তিনি জানান, এ বছর ২৩২টি খেজুরগাছ থেকে তাঁরা রস সংগ্রহ করছেন। প্রস্তুত করা প্রতিটি গাছ থেকে প্রতিদিন রস নেওয়া হয়। শুরুতে প্রতিটি গাছ থেকে দুই থেকে আড়াই কেজি রস পাওয়া যায়। পরে তা বেড়ে তিন থেকে চার কেজি পর্যন্ত হয়। মৌসুমের প্রথম দিকে প্রতিদিন আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ কেজি গুড় তৈরি হয়। পরে উৎপাদন বেড়ে এক থেকে দুই মণ পর্যন্ত পৌঁছায়। প্রতি কেজি গুড় পাইকারদের কাছে ২৩০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ২৬০ টাকায় বিক্রি করছেন তাঁরা।
শীতের আগমনে গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে খেজুরের রস দিয়ে পিঠা-পায়েস, গুড়ের মুড়ি-মুড়কি ও নানা ধরনের খাবার তৈরির আয়োজন শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, চিনির দাম বেশি হলেও খেজুরের গুড়ের দাম তুলনামূলক বেশি। তবে স্বাদ ও গন্ধের কারণে বাজারে এর চাহিদা রয়েছে।
গুড়ের ক্রেতা ও স্কুলশিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কার্তিক মাস থেকেই শীতের আমেজ শুরু হয়েছে। পিঠা-পায়েসের স্বাদ বাড়াতে খেজুরের গুড়ের তুলনা নেই। গাছিরা প্রকাশ্যে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করেন। তাই তাঁদের তৈরি নির্ভেজাল গুড় কিনতে এসেছেন তিনি। প্রতিদিনই অনেক মানুষ টাটকা গুড় কিনে নিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিধান কান্তি হালদারকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গাছিদের গুড় তৈরির কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। তাঁদের তৈরি গুড় সুস্বাদু এবং এলাকায় ক্রেতাদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিধান কান্তি হালদার বলেন, গাছিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে গুড় তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা সেভাবেই কাজ করছেন। শীতের আগমনে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির এই আয়োজন যেন গ্রামাঞ্চলে এক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের
ইনস্টাগ্রাম
ভিজিট করুন।