রংপুর বিভাগ

মাছের সংকটে ম্লান কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসব

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসব ঘিরে কুড়িগ্রামের খাল-বিল ও ছড়ায় মানুষের সমাগম বাড়ছে। মাছ ধরার আনন্দে নানা বয়সী মানুষ পানিতে নামলেও আগের মতো দেশি মাছ পাচ্ছেন না তাঁরা। মাছের সংকটের কারণে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি মাছ শিকারিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও উদ্বেগ।

রবিবার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ছড়ায় গিয়ে দেখা যায়, পলোসহ মাছ ধরার নানা উপকরণ নিয়ে পানিতে নেমেছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। কেউ পলোর ভেতরে হাত দিয়ে মাছ খুঁজছেন, কেউ আবার অন্য উপায়ে মাছ ধরার চেষ্টা করছেন। ছড়াজুড়ে মাছ ধরার এই দৃশ্যে ফুটে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা আনন্দঘন পরিবেশ।

মাছ শিকারে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় ফুলবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ছড়া, নালা, দোলা ও অন্যান্য জলাশয়ে দল বেঁধে পলো দিয়ে মাছ ধরার প্রচলন ছিল। তখন এসব জলাশয়ে দেশি মাছের প্রাচুর্য ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাছ কমে যাওয়ায় আগের মতো আনন্দ আর পাওয়া যাচ্ছে না।

মাছ শিকারিদের অভিযোগ, এক শ্রেণির মানুষ নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ ধরছে। এসব জালে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট মাছ ও মাছের পোনাও আটকা পড়ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং দিন দিন দেশি মাছের সংখ্যা কমছে।

ভাঙামোড় এলাকা থেকে উৎসবে মাছ ধরতে আসেন ইসমাইল হোসেন ও রফিকুল ইসলাম। তাঁদের মতে, মাছের সংকটের অন্যতম কারণ চায়না দুয়ারি জালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। পানির প্রবাহপথে পাতা এ সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ও পোনা আটকা পড়ে। এভাবে নির্বিচারে মাছ ধরা চলতে থাকলে দেশি মাছের প্রজনন ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।

রাবাইটারী এলাকা থেকে আসা ইকবাল হোসেন ও মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘আগে আমরা দল বেঁধে পলো দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার দোলা, ছড়া ও নালায় মাছ ধরতে যেতাম। মাছ ধরার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ ও প্রতিযোগিতা ছিল, কিন্তু এখন আর আগের মতো দেশি মাছ পাওয়া যায় না। চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারে দেশি মাছ বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়ছে।’

তাঁরা আরও বলেন, দেশি মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, ক্ষতিকর জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, ফুলবাড়ী উপজেলার বড় ছড়াগুলোর মধ্যে শিমুলবাড়ী ছড়া অন্যতম। একসময় এ ছড়ায় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন আগের মতো দেশি মাছ মিলছে না। তারপরও মাছ ধরার আশায় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন। দল বেঁধে পলো দিয়ে মাছ ধরার দৃশ্য দেখা গেলেও অনেকের মুখেই শোনা যায়, ছড়ায় এখন মাছের বড়ই অভাব।

মিজানুর রহমানের মতে, শিমুলবাড়ী ছড়ায় মানুষের সমাগম গ্রামীণ ঐতিহ্য ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনের আনন্দকে তুলে ধরে। তবে দেশি মাছ কমে যাওয়ার বিষয়টি নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। জলাশয়গুলোতে মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনতে মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যথাযথ উদ্যোগ ও নজরদারির মাধ্যমে শিমুলবাড়ী ছড়াসহ উপজেলার ছড়া, খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয়ে দেশি মাছের প্রাচুর্য ফিরবে। ফিরে আসবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসবের আগের প্রাণচাঞ্চল্য।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...