পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবদারুতলা বাজারে মৌসুমজুড়ে জমে ওঠে জলপাইয়ের বেচাকেনা। উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম জলপাইয়ের হাট হিসেবে পরিচিত এই বাজারে প্রতিদিন কেনাবেচা হয় প্রায় ৩০ লাখ টাকার ফল। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চলা এ বাণিজ্য ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করেন কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবহনকর্মীরা। তবে বিপুল বেচাকেনার বিপরীতে বাজারে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও পানির ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের পোহাতে হচ্ছে নানা দুর্ভোগ।
প্রতি কেজি জলপাই বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। হাটে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। কেউ বস্তায় করে বাগানের জলপাই নিয়ে আসেন, কেউ দরদাম করে পাইকারি দরে কিনে নেন। পঞ্চগড়ের পাশাপাশি নীলফামারীর ডোমার, রংপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখানে জলপাই বিক্রি করতে আসেন।
এই মৌসুমি বাণিজ্য স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি করেছে। পুরুষদের পাশাপাশি হাটে কাজ করছেন নারীরাও। তাঁদের একজন বিচিত্রা রানি। জলপাইয়ের বোটা কাটার কাজ করে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তিনি মজুরি পান প্রায় ৩০০ টাকা। আরেক নারী শ্রমিক জানান, এই কাজ থেকে পাওয়া আয় দিয়ে তিনি সংসারের খরচে সহায়তা করেন।
তবে ব্যস্ত এই বাজারে পণ্য কেনাবেচার জন্য নেই পর্যাপ্ত স্থায়ী অবকাঠামো। রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ব্যবসায়ীদের নিজেরাই সামিয়ানা টানিয়ে কাজ চালাতে হয়। বৃষ্টি হলে জলপাই ওজন করা, বস্তায় ভরা এবং গাড়িতে তোলার কাজ ব্যাহত হয়। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ভোগান্তিও বাড়ে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো জলপাই ধোয়া ও পরিষ্কারের জন্য পর্যাপ্ত পানির অভাব। বাজারজাত করার আগে ফল পরিষ্কার করা প্রয়োজন হলেও পানির সংকটে সেই কাজ ব্যাহত হয়। এতে ফলের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সংরক্ষণ ও পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
হাটের ইজারাদার কাদের কিবরিয়া রানা বলেন, হাট পরিচালনায় কিছু সমস্যা রয়েছে। সেগুলোর কয়েকটি তাঁরা নিজেরাই সমাধানের চেষ্টা করছেন। পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে স্থায়ী ছাউনি ও পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যবসায়ীদের এখনো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাঁর মতে, জলপাই সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নুর হোসেন বলেন, এত বড় একটি কৃষিপণ্যের বাজারে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকা জরুরি। শুধু বেচাকেনা বাড়লেই হবে না, বাজারের পরিবেশও পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে হবে। এ জন্য স্থায়ী ছাউনি নির্মাণ, নিরাপদ পানির সরবরাহ, পানি নিষ্কাশন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ী দিদার হোসেন জানান, এ হাটে জলপাইয়ের ভালো চাহিদা রয়েছে। এখান থেকে জলপাই ঢাকা, নাটোর ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। আচার তৈরির কারখানাগুলোতেও সরবরাহ করা হয় এই ফল।
দেবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাঈম মোর্শেদ বলেন, দেবদারুতলার এই মৌসুমি হাট উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম জলপাইয়ের বাজার। প্রতিবছর অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এখানে বেচাকেনা চলে। পঞ্চগড় ছাড়াও ডোমার, নীলফামারী ও রংপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জলপাই নিয়ে আসেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাটে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার জলপাই কেনাবেচা হয়। কৃষিপণ্য বিপণনের এই কেন্দ্র পঞ্চগড়ের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জলপাইয়ের এই বাজারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের আরও বিকাশ ঘটানো সম্ভব। তবে সে জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত অবকাঠামো, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত পানির সরবরাহ। পাশাপাশি জলপাই সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লাভের সুযোগ বাড়বে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চান, উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপাইয়ের হাটকে আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত বাজার হিসেবে গড়ে তুলতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাঁদের প্রত্যাশা, স্থায়ী ছাউনি, উন্নত পানির ব্যবস্থা এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে বাজারটিকে পরিকল্পিত কৃষিপণ্য বিপণনকেন্দ্রে রূপ দেওয়া হবে।
📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের
ইনস্টাগ্রাম
ভিজিট করুন।