জাতীয়

তরুণদের কর্মসংস্থান ও বয়স্কদের নিরাপত্তায় এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ

২০৫১ সালে ‘বয়স্ক অর্থনীতিতে’ পরিণত হবে বাংলাদেশ। তবে জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগাতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দেরি হলে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক সম্পদ না হয়ে বোঝায় পরিণত হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার সামনে এখন ১১৭ কোটি কর্মক্ষম মানুষের বিশাল জনমিতিক সুযোগ রয়েছে। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশে ২০৪৯ সালের মধ্যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। বাংলাদেশে তা ঘটবে ২০৫১ সালে। ফলে অন্য অনেক দক্ষিণ এশীয় দেশের তুলনায় জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশ কিছুটা বেশি সময় পাবে। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, আগামী এক দশকের কম সময়ের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করবে। ২০৪৯ সালের মধ্যে অঞ্চলটি ‘বয়স্ক অর্থনীতিতে’ পরিণত হবে। তখন ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত দাঁড়াবে ১৪ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পর্যায় আসবে ২০৫১ সালে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যার বার্ধক্যে রূপান্তর অনেক দ্রুত ঘটছে। তাছাড়া, মাথাপিছু আয় তুলনামূলক কম থাকা অবস্থাতেই দেশগুলোকে এ পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বার্ষিক ০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শ্রম উৎপাদনশীলতা ১ দশমিক ১ শতাংশ বাড়াতে সহায়তা করেছে। তবে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধিতে জনসংখ্যার এ বার্ষিক অবদান কমে মাত্র ০ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসবে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলো উন্নয়নের পথে এগোতে গিয়ে আরও দ্রুত এবং তুলনামূলক কম বয়সেই বয়স্ক হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই এমন নীতি গ্রহণ ও অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা বেশি ও উন্নত মানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এর মাধ্যমে যুব লভ্যাংশের সুফল বাড়ানোর পাশাপাশি বার্ধক্যের জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অনুকূল বয়সকাঠামো থাকলেও তা পুরোপুরি কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো যায়নি। সীমিত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমশক্তিতে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং মানবসম্পদের ঘাটতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮৪ শতাংশ বা ৫ কোটি ৮০ লাখ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, উচ্চশিক্ষা বা ডিগ্রি অর্জনের পরও ৪৪ শতাংশ স্নাতক অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে ধীরগতিতে। সম্প্রতি ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেককে কর্মী ছাঁটাইও করতে হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জাঁ পেসম বলেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগানো নির্ভর করছে এখন দেশটি কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর। ভালো চাকরি সৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা, তরুণদের শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতায় দক্ষ করে তোলা এবং নারীদের কর্মসংস্থানের বাধা দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও বৃদ্ধ বয়সে আয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতিও শুরু করতে হবে।

প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। চাকরি না পেলে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তাঁরা বলেন, এটিই এখন মূল উদ্বেগের বিষয়।

পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তাঁরা বলেন, শুধু তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা কিংবা তাদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে তোলাই যথেষ্ট নয়। সরকারি খাতে চাকরির সুযোগ সীমিত হওয়ায় মূল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে বেসরকারি খাতকে। এ জন্য বেসরকারি খাতের বিকাশ ও কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

অনানুষ্ঠানিক খাতের নিম্ন উৎপাদনশীলতা প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, পশ্চিমা ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যখন এ ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাদের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রভাব এতটা শক্তিশালী ছিল না। তাই আইন বা বিধিনিষেধ চাপিয়ে রাতারাতি অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক করা সম্ভব নয়। বরং এ খাতের সঙ্গে কাজ করতে হবে, প্রণোদনা দিতে হবে এবং তাদের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে।

উর্বরতার হার কমে যাওয়া প্রসঙ্গে কর্মকর্তারা বলেন, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উর্বরতার হার একবার কমতে শুরু করলে সাধারণত তা আগের অবস্থায় ফিরে যায় না। অর্থ বা প্রণোদনা দিয়ে কৃত্রিমভাবে উর্বরতার হার বাড়ানোর পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলোও বিশ্বে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য প্রতিবেদনে কয়েকটি করণীয় তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য অর্থায়ন সহজ করা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক প্রক্রিয়া সরল করা। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতার মান উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং পেনশনব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে বার্ধক্যজনিত পরিবর্তন থেকেও অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব। বিশ্বব্যাংক একে ‘দ্বিতীয় জনমিতিক লভ্যাংশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ ধরনের ব্যবস্থা বয়স্ক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি তাঁদের সঞ্চয় বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...