বিশ্ব

ছিনতাই হওয়া ইরানি মাছধরা নৌযান উদ্ধার করল ভারতীয় নৌবাহিনী, মুক্ত ২০ নাবিক

সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের ছিনতাই করা ইরানের মাছধরা নৌযান ‘আজিনি’ এবং এর ২০ নাবিককে উদ্ধার করেছে ভারতীয় নৌবাহিনী। আরব সাগরে ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অভিযান চালিয়ে সোমবার উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করা হয় বলে জানিয়েছে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। নৌযানটি ভারতের মুম্বাই থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল।

মঙ্গলবার ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং উদ্ধার অভিযানের বিষয়টি জানান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় নৌবাহিনীর সদস্যরা নৌযানটির অবস্থান শনাক্ত করে সমুদ্র ও আকাশপথে নজরদারি চালান। পরে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে নৌযানটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং সেখানে থাকা ২০ জন ইরানি নাবিককে মুক্ত করেন।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযানে ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ, একটি সামুদ্রিক নজরদারি বিমান এবং মেরিন কমান্ডোরা অংশ নেন। অতিরিক্ত কমান্ডো সদস্যদের পাঠাতে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সি-১৭ পরিবহন বিমান ব্যবহার করা হয়। বিমানটি আকাশ থেকে অতিরিক্ত কমান্ডো সদস্যদের নামিয়ে দেয়। সমুদ্র ও আকাশপথের সমন্বিত নজরদারির মাধ্যমে জলদস্যুদের অবস্থান ও নৌযানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়।

পান্টল্যান্ড মেরিটাইম পুলিশ ফোর্সের এক কর্মকর্তা এপিকে জানান, ভারতীয় বাহিনী অভিযানে ১২ জন সন্দেহভাজন সোমালি জলদস্যুকে নিরস্ত্র করে। তাদের মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি এসব তথ্য দেন।

ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন জলদস্যুদের পাশাপাশি দুই সোমালি নিরাপত্তারক্ষীও পরে সোমালিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বান্দার বায়লা এলাকায় ফিরে আসেন। সেখানে পৌঁছানো ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজনের সামান্য আঘাত ছিল। তবে তাঁরা জলদস্যু, নাকি নিরাপত্তারক্ষী—তা নিশ্চিত করতে পারেননি ওই কর্মকর্তা। কীভাবে তাঁরা আহত হয়েছেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানাননি তিনি।

অন্যদিকে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অভিযানটি কোনো প্রাণহানি বা আঘাত ছাড়াই শেষ হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এ তথ্যের আওতায় নৌযানে থাকা সবাই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, নাকি শুধু উদ্ধার হওয়া নাবিকেরা—তা স্পষ্ট করা হয়নি। উদ্ধার করা নাবিকদের নৌযানেই রাখা হয়েছে, নাকি অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বিবৃতি এবং পান্টল্যান্ডের কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়ে গেছে।

‘আজিনি’ নৌযানটি গত ২৯ অক্টোবর সোমালিয়ার বান্দার বায়লা ও হাফুন এলাকার মধ্যবর্তী সমুদ্রপথে ছিনতাই হয়েছিল। এর আগে পান্টল্যান্ডের একজন সামুদ্রিক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, নৌযানটিতে ২১ জন ইরানি নাবিক এবং দুইজন সোমালি নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। কিন্তু ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উদ্ধার করা হয়েছে ২০ জন নাবিককে। নাবিকের সংখ্যায় এই পার্থক্যের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

ছিনতাইয়ের পর নৌযানটির অবস্থান ও জলদস্যুদের গতিবিধি শনাক্ত করতে ভারতীয় বাহিনী সমুদ্র ও আকাশপথে নজরদারি চালায়। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, জলদস্যুরা নৌযানটিকে ভাসমান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। সে কারণে নৌযানটি দ্রুত উদ্ধার করা জরুরি হয়ে পড়ে। আরব সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ রুট রয়েছে। এই অঞ্চলে জলদস্যুদের তৎপরতা বাড়লে জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সোমালিয়ার উপকূলে সাম্প্রতিক সময়ে জলদস্যুতার ঘটনা আবারও বাড়ছে। এডেন উপসাগর এবং পশ্চিম ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাইয়ের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এপি জানিয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত জলদস্যুরা ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই করেছিল। এসব ঘটনার মধ্যে সোমালিয়ার উপকূল থেকে অনেক দূরে সংঘটিত ছিনতাইও রয়েছে।

ছিনতাই হওয়া জাহাজগুলোর একটি ছিল তেলজাত পণ্যবাহী ট্যাংকার ‘সিবু-১’। ইয়েমেনের আল-মুকাল্লা এলাকার পূর্বদিকে প্রায় ২৫২ কিলোমিটার বা ১৩৬ নটিক্যাল মাইল দূরে জাহাজটি ছিনতাই করা হয়েছিল। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, জলদস্যুরা শুধু সোমালিয়ার উপকূলীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই; তারা দূরবর্তী সমুদ্রপথেও বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হচ্ছে।

গত সেপ্টেম্বরে পান্টল্যান্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ‘এমটি অনার-২৫’ নামের একটি ট্যাংকারের পাঁচ নাবিককে হত্যা করেছে জলদস্যুরা। ট্যাংকারটি এপ্রিল থেকে জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরে নিরাপত্তা বাহিনী জাহাজটি উদ্ধার করে এবং ১৬ জন সন্দেহভাজন জলদস্যুকে আটক করে। এই ঘটনাও সোমালিয়ার জলদস্যুতা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সোমালিয়ার জলদস্যুতা একসময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছিল। ভারত মহাসাগর ও এডেন উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একের পর এক জাহাজ ছিনতাইয়ের কারণে বিভিন্ন দেশকে আন্তর্জাতিক নৌ-টহল জোরদার করতে হয়েছিল। আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর টহল এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে গত এক দশকে জলদস্যুতার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো আবারও সেই হুমকির প্রত্যাবর্তনের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

বর্তমানে ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে। হরমুজ প্রণালিতে হামলা ও নিরাপত্তা হুমকি এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হুমকির কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরব-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

এসব পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে তেল পরিবহনেও। কিছু জাহাজকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে হওয়ায় কোনো কোনো তেলবাহী জাহাজের যাত্রায় এক মাস পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। এতে জাহাজ পরিচালনার খরচ বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।

ভারতীয় নৌবাহিনীর এই উদ্ধার অভিযান এমন এক সময়ে সম্পন্ন হলো, যখন আরব সাগর ও পশ্চিম ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরানি নৌযানটি উদ্ধার এবং ২০ নাবিককে মুক্ত করার মধ্য দিয়ে ভারতীয় বাহিনী ওই অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে নিজেদের সক্রিয় ভূমিকা তুলে ধরেছে। তবে জলদস্যুদের পুনরুত্থান এবং বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে চলমান হামলার আশঙ্কা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক নৌ-টহল ও আঞ্চলিক সহযোগিতা কতটা কার্যকর হয়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সূত্র: এপি

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...