বিশ্ব

অভিবাসীর ঢলে বিপর্যস্ত স্পেনের এল হিয়েরো, জরুরি অবস্থা ঘোষণা

পশ্চিম আফ্রিকা থেকে নৌকায় করে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী ও শরণার্থীর আগমনে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের এল হিয়েরোতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জরুরি সহায়তা চেয়েছে দ্বীপটির স্থানীয় প্রশাসন। মাত্র নভেম্বর মাসের প্রথম কয়েক দিনে ৩ হাজার ৩০০ জনের বেশি অভিবাসী দ্বীপটিতে পৌঁছেছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, এভাবে অভিবাসীর আগমন অব্যাহত থাকলে সীমিত জনবল ও অবকাঠামো দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

রোববার, ৮ নভেম্বর প্রকাশিত আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম দ্বীপ এল হিয়েরোতে অভিবাসী ও শরণার্থীদের আগমন হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। দ্বীপটির প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা প্রয়োজন।

এল হিয়েরোর গভর্নিং কাউন্সিলের প্রধান আলপিদিও আরমাস স্পেনের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেন, দ্বীপটিতে অভিবাসীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ পরিস্থিতিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণার উদ্দেশ্য হলো উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের শুরু থেকে প্রায় ৩০টি নৌকায় করে ৩ হাজার ৩০০ জনের বেশি অভিবাসী দ্বীপটিতে পৌঁছেছেন। অথচ এল হিয়েরোর মোট বাসিন্দার সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার ৪০০। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যে দ্বীপটির জনসংখ্যার তুলনায় বিপুলসংখ্যক নতুন মানুষের আগমন ঘটেছে। এর ফলে আশ্রয়, খাবার, চিকিৎসা এবং জরুরি সেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

দ্বীপটির প্রশাসন নতুন আসা অভিবাসীদের জন্য অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে। তবে সীমিত জায়গার কারণে সবাইকে উপযুক্ত পরিবেশে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান আরমাস জানিয়েছেন, দ্বীপের হাসপাতালের পরিস্থিতিও এখন অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেছে। অভিবাসীদের চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সেবা দিতে গিয়ে বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের আঞ্চলিক নেতা ফার্নান্দো ক্লাভিহো পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে অসহনীয় বলে বর্ণনা করেছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে তাঁর এই বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, অভিবাসীদের আগমনের কারণে পরিবহন ও চিকিৎসাসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। এমনকি অভিবাসীদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাস চলাচলও অন্য কাজে ব্যবহার করতে হচ্ছে। পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে অন্যান্য দ্বীপ থেকে স্বাস্থ্যকর্মী আনা হয়েছে।

ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে অভিবাসীদের আগমন নতুন ঘটনা নয়। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনের এই দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম বিপজ্জনক সমুদ্রপথ হিসেবে পরিচিত এই রুটে প্রতিবছর বহু মানুষ প্রাণ হারান। ছোট ও অনিরাপদ নৌকায় দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা, খাবার ও পানির সংকট এবং প্রতিকূল আবহাওয়া যাত্রীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

এল হিয়েরো দ্বীপটি পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথের মধ্যে পড়ে। এ কারণে দ্বীপটির অবস্থান অভিবাসন সংকট মোকাবিলায় স্পেনের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে যাত্রা শুরু করা নৌকার সংখ্যা বেড়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাত্রা করা একটি নৌকা থেকে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বেঁচে ফেরা যাত্রীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সমুদ্রযাত্রার সময় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে দ্বীপপুঞ্জটির আশপাশে অন্তত নয়জন অভিবাসী ও শরণার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

স্পেনের সামুদ্রিক উদ্ধারকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের প্রথম ছয় দিনে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উপকূল থেকে ৩ হাজার ২৬১ জন অভিবাসী ও শরণার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে। এই সংখ্যা শুধু দ্বীপে পৌঁছানো মানুষের হিসাব নয়; সমুদ্রপথে বিপদে পড়া অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরাও এর অন্তর্ভুক্ত।

ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে ২০২৪ সালে অভিবাসী আগমনের সংখ্যা ৪৬ হাজার ছাড়িয়ে রেকর্ড গড়েছিল। এরপর নজরদারি জোরদার এবং অভিবাসীদের যাত্রা শুরুর দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর ফলে আগমনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আবারও আগমনের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। আঞ্চলিক নেতা ক্লাভিহোর মতে, বর্তমানে কিছু কিছু দিনে অভিবাসী আগমনের গতি ২০২৪ সালের রেকর্ড সময়ের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সমুদ্রপথে ১৩ হাজার ৩২৭ জন অনিয়মিত অভিবাসী ও শরণার্থী ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম। অর্থাৎ বছরের প্রথম ১০ মাসে সামগ্রিকভাবে আগমন কিছুটা কম থাকলেও নভেম্বরের শুরুতে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে।

অভিবাসীদের যাত্রা শুরুর স্থানও পরিবর্তিত হচ্ছে। সেনেগাল, মৌরিতানিয়া ও মরক্কোর উপকূলে নজরদারি বাড়ানোর কারণে অনেক নৌকা এখন আরও দক্ষিণের দেশ গাম্বিয়া, গিনি-বিসাউ ও গিনি থেকে যাত্রা শুরু করছে। এতে সমুদ্রপথের দূরত্ব বাড়ছে এবং যাত্রীদের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।

শনিবার সেনেগালের পুলিশ রাজধানী ডাকারের উপকূল থেকে নারী ও শিশুসহ ১৪২ জন অভিবাসীকে আটক করেছে। এই ঘটনা পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টার ব্যাপকতা তুলে ধরেছে।

এল হিয়েরোর জরুরি অবস্থা ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পেনের অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় নতুন করে চাপের বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয় প্রশাসন এখন আশ্রয়, চিকিৎসা, উদ্ধার অভিযান এবং অন্যান্য জরুরি সেবা সচল রাখতে কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা চাইছে। তবে অভিবাসী আগমন কমাতে কী ধরনের নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এই প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।

সূত্র: আলজাজিরা

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...