ইরানের ওপর সামরিক ও কৌশলগত চাপ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির স্থলপথে অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম, দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি এবং নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত বিভিন্ন উপকরণ পরিবহন বন্ধ করতে নতুন একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে কয়েক মাস ধরে চলা মার্কিন নৌ অবরোধের পর এবার স্থলসীমান্ত এবং কাস্পিয়ান সাগরকেও নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রোববার, ৮ নভেম্বর প্রকাশিত আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেন্টকম শনিবার নতুন এই টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেয়। ‘টাস্কফোর্স আয়রন গেট’ নামের এই ইউনিটের প্রধান কাজ হবে ইরানের স্থলপথে সামরিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্য পরিবহন প্রতিরোধ করা। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সামরিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী সেন্টকম জানিয়েছে, সমুদ্রপথে ইরানের ওপর যে অবরোধ কার্যকর রয়েছে, নতুন উদ্যোগ তার পরিধি আরও বাড়াবে।
সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, নতুন টাস্কফোর্স সমুদ্রপথে চলমান অবরোধের কার্যকারিতা আরও জোরদার করবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পায় অবস্থিত এই ইউনিট অন্যান্য মার্কিন সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। ইরানের স্থলসীমান্ত এবং কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে উন্নত অস্ত্রব্যবস্থা, দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত সামগ্রী এবং অবৈধ অর্থের প্রবাহ বন্ধ করাই এর লক্ষ্য।
দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি বলতে এমন প্রযুক্তি বা সরঞ্জামকে বোঝায়, যা বেসামরিক কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি সামরিক ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে নতুন এই উদ্যোগের আওতায় শুধু সরাসরি অস্ত্র পরিবহন নয়, সামরিক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় ব্যবহার হতে পারে এমন বিভিন্ন উপকরণের চলাচলও নজরদারির মধ্যে আসতে পারে।
সাবেক মার্কিন উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল মুলরয় আলজাজিরাকে বলেন, নতুন টাস্কফোর্সের কাজ হবে ইরানে অস্ত্রব্যবস্থা কোথা থেকে প্রবেশ করছে, কীভাবে সেগুলোর সরবরাহ বন্ধ করা সম্ভব এবং দেশটি কীভাবে জ্বালানি পরিবহন করছে, তা শনাক্ত করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি সংঘাত আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেন, তাহলে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে এসব সরবরাহ ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থাও বিবেচনায় আসতে পারে।
মুলরয় আরও বলেন, আগের সামরিক অভিযানের তুলনায় নতুন পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত স্থাপনাগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি তাঁর বিশ্লেষণ; নতুন টাস্কফোর্সের ঘোষিত দায়িত্বের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়টি এক করে দেখার সুযোগ নেই।
স্থলপথে অবরোধ বিস্তারের ঘোষণার পাশাপাশি শনিবার ওমান উপসাগরে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ অচল করে দেওয়ার কথাও জানিয়েছে সেন্টকম। মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিবৃতি অনুযায়ী, সেন্ট কিটসের পতাকাবাহী ‘এমভি হুদা’ নামের জাহাজটিকে প্রথমে সতর্ক করা হয়। পরে জাহাজের নির্দিষ্ট অংশ খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর একটি মার্কিন সামরিক বিমান জাহাজটির পেছনের অংশে নির্ভুল নিশানায় গোলাবর্ষণ করে সেটিকে অচল করে দেয়।
সেন্টকমের দাবি, গত জুলাই থেকে অবরোধ কার্যকর করার সময় মার্কিন বাহিনী ১৪৭টি বাণিজ্যিক জাহাজকে পথ পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। পাশাপাশি নির্দেশ অমান্য করায় পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজ অচল করা হয়েছে। এসব তথ্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর দেওয়া; স্বাধীনভাবে সব ঘটনার বিস্তারিত যাচাইয়ের তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
এদিকে হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার দ্বীপটিতে দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। একই সঙ্গে জাস্ক, সিরিক ও বন্দর আব্বাস শহরেও কয়েকটি বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগের দিন কেশম দ্বীপে নতুন হামলার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। তবে তিনি হামলাকে সীমিত বা ছোট আকারের বলে বর্ণনা করেন। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান এখনো সমঝোতায় আগ্রহী এবং কাতারের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের নৌবাহিনী জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালির কাছে দুটি তেলবাহী জাহাজ মাইনে আঘাত পেয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নৌবাহিনীর বরাত দিয়ে বলা হয়, জাহাজ দুটি প্রণালির একটি অনিরাপদ এলাকা দিয়ে চলাচলের সময় তাদের নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ রেখেছিল। পরে সেগুলো সমুদ্রের মাইনে আঘাত পেয়ে গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চলাচল বন্ধ করে দেয়। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও অন্যান্য পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালিকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নয়, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
একই দিনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে আগুন লাগা একটি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে ২২ জনকে উদ্ধারের খবরও জানিয়েছে আলজাজিরা। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দুটি তেলবাহী জাহাজ মাইনে আঘাত পাওয়ার দাবি করার পর এই উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়। তবে জাহাজে আগুন লাগার সঙ্গে ওই ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা হয়নি।
সব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন স্থলপথভিত্তিক উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সমুদ্রপথে অবরোধের পাশাপাশি স্থলসীমান্ত ও কাস্পিয়ান সাগরের সরবরাহব্যবস্থাকে নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইরানের সামরিক ও বাণিজ্যিক পরিবহনের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে নতুন উদ্যোগের পরিধি এবং এর বাস্তব প্রভাব কতটা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সূত্র: আলজাজিরা
📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের
ইনস্টাগ্রাম
ভিজিট করুন।