দিনাজপুর

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে রাজা-জমিদারদের প্রতিষ্ঠিত, হাজার বছরের ঐতিহ্যের দুর্গাপূজা মেলা বসেছিল

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে প্রতিবারের ন্যায় এবারো বসেছিল রাজা-জমিদারদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হাজার বছরের ঐতিহ্যের দুর্গাপুজা মেলা।

রাজা-জমিদারদের আমলে শুরু হওয়া এক আয়োজন, যা সময়ের পরিক্রমায় পরিণত হয়েছে সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায়।

শাখা যমুনা নদীর তীরে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বসা ঐতিহ্যবাহী এ মেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এলাকার ইতিহাস, ধর্মীয় আবেগ ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্মৃতি। কেউ এ মেলাকে শত বছরের ঐতিহ্য বলে উল্লেখ করেন, আবার আয়োজকদের দাবি, এর ইতিহাস হাজার বছরের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এ মেলা আজও টানে দূরদূরান্তের মানুষকে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) ফুলবাড়ী সরকারি কলেজ মাঠে বসেছিল দুর্গাপূজা মেলা। দুর্গোৎসবের আনন্দের সঙ্গে মেলাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রতিমা দর্শন, কেনাকাটা আর স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটাতে ফুলবাড়ীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন নানা বয়সী মানুষ।

স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় এ অঞ্চলে হিন্দু ধর্মাবলম্বী রাজা-জমিদারদের বসতি ছিল। তাঁরাই শাখা যমুনা নদীর তীরে প্রতিবছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে এ মেলার আয়োজন করতেন। নদীপথে দূরদূরান্ত থেকে যেন ভক্তরা সহজে এসে দুর্গাপ্রতিমা দর্শন করতে পারেন, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই মেলার আয়োজন করা হতো বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।

তখনকার মেলা শুধু ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেখানে কেনাবেচা হতো ঘর-গৃহস্থালির নানা উপকরণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। নদীপথে মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে মেলাটি ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় আজও ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষ এ মেলায় আসেন।

মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, আশপাশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপের দুর্গাপ্রতিমা সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিমা দর্শন ও বিসর্জন উপলক্ষে দর্শনার্থীদের পদচারণে মুখর পুরো এলাকা। মেলায় বসেছে শাঁখা, সিঁদুর, চুড়ি, মালা ও দুলের দোকান। রয়েছে রামায়ণ, মহাভারতসহ হিন্দুধর্মের বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক বই, শিশুদের খেলনা, মিঠাই-মিষ্টান্ন, ফুল ও মৌসুমি ফলের পসরা। পাশাপাশি রয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাহারি খাবার এবং ঘরের শোভাবর্ধনের নানা উপকরণ। সব মিলিয়ে মেলা হয়ে উঠেছে কেনাকাটা ও বিনোদনের এক প্রাণবন্ত আয়োজন।
বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখা সাধারন সম্পাদক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আনন্দ কুমার গুপ্তা বলেন, এ মেলা ফুলবাড়ীর হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করছে। ফুলবাড়ী ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা মেলায় আসেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ আয়োজন এলাকার মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

মেলায় এসেছেন ষাটোর্ধ্ব কফিল উদ্দিন। শৈশবের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এ মেলায় আসা শুরু করেছিলেন। বয়স বেড়েছে, কিন্তু মেলার প্রতি টান কমেনি। তাই এখনো মেলায় আসেন। তাঁর মতো এ এলাকার বিভিন্ন ধর্মের মানুষও সন্তানদের নিয়ে মেলায় এসেছেন।

মেলার আয়োজকদের ভাষ্য, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মেলার আয়োজন হলেও এখানে কোনো একটি ধর্মের মানুষের উপস্থিতিই মুখ্য নয়। সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মেলাটি দীর্ঘদিন ধরে সর্বজনীন উৎসবের রূপ পেয়েছে। ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে গড়ে ওঠা এ মিলনমেলা স্থানীয় মানুষের সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এদিকে মেলায় প্রতিমা দর্শন ও কেনাকাটা করতে আসা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে পুলিশের টহল দল ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম।

ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ বলেন, মেলায় প্রতিমা দর্শনে আসা ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের টহল ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম চালু রয়েছে।

রাজা-জমিদারদের আমলের সেই আয়োজন আজ কত বছরের পুরোনো, তা নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দাবি। তবে সময়ের ব্যবধানে মেলার পরিসর ও আয়োজনের ধরন বদলালেও মানুষের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। দুর্গোৎসবের আনন্দ, ঐতিহ্যবাহী কেনাকাটা আর ধর্ম-বর্ণের মানুষের মিলন—সব মিলিয়ে শাখা যমুনার তীরে ফুলবাড়ীর এ মেলা এখনো ধরে রেখেছে তার স্বতন্ত্র পরিচয়।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...