এক টুকরো ভিটেমাটিও নেই। পরিবারের সঙ্গে থাকেন অন্যের জমিতে ভাঙা চালাঘরে।
অভাবের সংসারে লেখাপড়ার খরচ জোগাতে দিনমজুরি এমনকি হোটেল বয়ের কাজও করেছেন। এসব সত্ত্বেও এবারের এইচএসসিতে জিপি-এ ৫ পাওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি।
পুরো নাম বিশাল সরকার কৌশিক। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন বিজ্ঞান বিভাগ থেকে।
পাশের কাঁঠালবাড়ী বিদ্যাকানন থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়ে ভর্তি হন কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে এসএসসিতে সব বিষয়ে এ প্লাস পেয়ে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। এরপর বড় হওয়ার স্বপ্ন দানা বাঁধতে থাকে। ভর্তি হন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে।
চলতি বছর এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়ের মধ্যেও সফলদের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে বিশাল সরকার কৌশিক নামটি।
কুড়িগ্রাম সদরের কাঁঠালবাড়ী বাজারের পাশে বিশালদের জীর্ণ তিনটি চালাঘর। পরের জমিতে গড়ে তোলা সেই ঘরে বাবা-মা আর বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকেন বিশাল। রবিবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ছোটখাটো ভাঙাচোরা তিনটি চালাঘর। পুরনো টিনের চালে অসংখ্য ফুটো।
বাঁশঝাড়ের এক কোণায় খোলা রান্নাঘর।
বিশালের মা কণা রানী একটি কিন্ডারগার্টেনের আয়া। সামান্য সম্মানি পান। বাবা সুকুমার সরকার অসুস্থতা সত্ত্বেও সপ্তাহে দুই দিন গ্রামের হাটে চা বিক্রি করেন, কিন্তু সংসারের বোঝা আরো ভারী হয়েছে ঋণের দায়ে।
পরিবার সূত্র জানায়, অভাব আর ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন বিশালের মা। সেই ঋণের কিস্তি শোধ করার মতো আয় না হওয়ায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আশা থেকে আরো ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন।
সপ্তাহে দুই হাজার ৩০০ টাকার কিস্তির ভার সইতে না পেরে ধার করেন আরো ৫০ হাজার টাকা। এভাবেই ঋণের জালে জড়ায় সহায় সম্বলহীন পরিবারটি। বড় ছেলে কর্ণ সরকার টিউশনি করিয়ে নিজের পড়ালেখার খরচ জোগান।
বিশাল জানান, স্কুলে ভর্তির পর বন্ধুর দেওয়া পুরনো প্যান্ট আর জুতা দিয়েই শুরু হয় তার স্কুলজীবন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে পারেননি। পরে কয়েকজন শিক্ষক তাকে বিনা ফিতে পড়ান। এইচএসসিতেও সহযোগিতা করেন এক প্রবাসী ও শিক্ষকরা।
বিশালের ভাষ্য, অটো ভাড়া না থাকায় অনেক দিন স্কুল ও কলেজে যাওয়া হয়নি। প্রায়ই দিনভর অভুক্ত থেকেছেন। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন বিশাল। কিন্তু খরচ দিতে পারছিলেন না তার বাবা। এবারও কয়েকজন শিক্ষক তাকে বিনা ফিতে পড়ান।
বিশালের বাবা সুকুমার সরকার জানান, তার তিন ছেলে-মেয়ে সবাই মেধাবী। সড়কের পাশে তার একটি ছোট চায়ের দোকান ও বসবাসের ঘর ছিল। ২০২০ সালে ঘরবাড়ি উচ্ছেদের সঙ্গে সেটিও উচ্ছেদ করে প্রশাসন। এর পর থেকে এক প্রতিবেশীর সুপারি বাগানে মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলে তাদের।
সুকুমার সরকারের বড় ছেলে কর্ণ সরকার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে অনার্সে পড়েন। কর্ণ জানান, চরম অভাব অনটনের মধ্যেও তার ছোট ভাইয়ের সাফল্যে আনন্দের বদলে কান্না এসেছিল। তার স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে তা নিয়েই এখন পরিবারের সবার দুশ্চিন্তা।
বিশালের মা কণা রানীর ভাষ্য, তাদের দুজনের সামান্য আয়ে সংসারের খরচ মেটে না, তার ওপর রয়েছে ঋণ। এ অবস্থায় ছেলের স্বপ্ন পূরণে লেখাপড়ার খরচ জোগানোর কোনো উপায় দেখছেন না। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে তার ছেলেটির স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।
📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের
ইনস্টাগ্রাম
ভিজিট করুন।