দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হতে আর মাত্র এক দিন বাকি। অথচ প্রতিযোগিতাকে ঘিরে রাজধানী ঢাকায় এখনো প্রত্যাশিত উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়নি। দলগুলোর আগমন, অনুশীলনের সময়সূচি, সংবাদমাধ্যমকে তথ্য সরবরাহ এবং প্রচারণার ঘাটতি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তবে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল আয়োজন ঘিরে কোনো সাংগঠনিক বিভ্রান্তি থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রত্যাশিত প্রচারণা ও উন্মাদনা তৈরি না হওয়ায় নিজের হতাশার কথাও স্বীকার করেছেন তিনি।
‘দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ’ হিসেবে পরিচিত ছয় জাতির এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে মালদ্বীপ ছাড়া বাকি সব দল ইতোমধ্যে ঢাকায় পৌঁছেছে। আগামীকাল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ দিয়ে প্রতিযোগিতার পর্দা উঠবে। উদ্বোধনী দিনের আরেক ম্যাচে স্বাগতিক বাংলাদেশ মুখোমুখি হবে ভুটানের। তবে প্রতিযোগিতা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তেও ঢাকায় বড় কোনো আন্তর্জাতিক ফুটবল আসরের পরিচিত আবহ চোখে পড়ছে না।
এর আগে ২০০৩, ২০০৯ ও ২০১৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সময় ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিল বাফুফে। শহরের বিভিন্ন স্থানে উৎসবের সাজসজ্জা, বিলবোর্ড ও ব্যানার স্থাপন করে প্রতিযোগিতার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এবার সেই ধরনের আয়োজন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এই ফুটবল প্রতিযোগিতা ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রত্যাশিত আগ্রহ তৈরি হয়নি।
এবার ঢাকায় প্রথমবারের মতো ছয় দলের সিনিয়র পুরুষদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের মূল দায়িত্ব পালন করছে সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সাফ) সচিবালয়। এ ক্ষেত্রে লজিস্টিক ও সাংগঠনিক সহায়তা দিচ্ছে বাফুফে। তবে দুই সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। প্রয়োজনীয় তথ্য, দলগুলোর আগমনের ছবি এবং অনুশীলনের সময়সূচি সংগ্রহ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন সংবাদকর্মীরা।
বাফুফে ভবনে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ দলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তাবিথ আউয়াল। আজারবাইজানে অনুষ্ঠিত ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভ্যালের ই-টায়ারে রানার্সআপ হওয়া বাংলাদেশ দলের সংবর্ধনা শেষে তিনি বলেন, বাফুফে ও সাফের মধ্যে যোগাযোগের কোনো ঘাটতি নেই এবং আয়োজন নিয়ে কোনো বিভ্রান্তিও নেই।
তাবিথ জানান, প্রতিযোগিতা আয়োজনের মূল দায়িত্ব সাফের হলেও আঞ্চলিক ফুটবলের এই আসর সফল করতে বাফুফের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব রয়েছে। সে কারণেই তারা সাফকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে। তবে আয়োজনের প্রস্তুতি ও প্রচারণা নিয়ে নিজের অসন্তোষের কথাও গোপন করেননি তিনি।
বাফুফে সভাপতি বলেন, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে ঘিরে যে ধরনের প্রচারণা ও উন্মাদনা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা এখনো দেখা যায়নি। আয়োজনের দিক নিয়েও তিনি হতাশ। তবে প্রতিযোগিতা শুরু হলে ধীরে ধীরে দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দলগুলোর ঢাকায় আগমন ঘিরেও তথ্য সরবরাহে ঘাটতি দেখা গেছে। সোমবার ঢাকায় পৌঁছায় ভুটান। এরপর গতকাল আসে শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তান। কিন্তু দলগুলোর আগমন সম্পর্কে সময়মতো আনুষ্ঠানিক তথ্য কিংবা ছবি সরবরাহ করেনি সাফ বা বাফুফে।
এ বিষয়ে বাফুফের এক কর্মকর্তা সাফের ওপর দায় চাপিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দলগুলোর আগমন কাভার করার জন্য সাফের কাছে একজন ফটোগ্রাফার চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই ব্যবস্থা করা হয়নি। বাফুফের নিজস্ব ফটোগ্রাফার পাঠানো সম্ভব হলেও তাঁর পারিশ্রমিক সাফ দিতে রাজি ছিল না। এ কারণে নিজেদের ফটোগ্রাফার দিয়ে কাজ করানোর প্রয়োজনীয়তা দেখেননি ওই কর্মকর্তা।
ভারতীয় দল ২৩ সদস্যের স্কোয়াড থেকে ১৯ জন খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফের পাঁচ সদস্য নিয়ে ঢাকায় এসেছে। তবে এই তথ্যও আয়োজকদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি; সরাসরি ভারতীয় দলের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত দলগুলোর অনুশীলনের সময়সূচি ও ভেন্যু সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।
এদিকে প্রতিযোগিতা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা দুই ম্যাচ কমিশনার ইতোমধ্যে ঢাকায় পৌঁছেছেন। তাঁদের একজন ভুটান ও অন্যজন ভারতের প্রতিনিধি। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ওমানের রেফারি এবং সহকারী রেফারিদেরও গত রাতে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল।
এ ছাড়া থাইল্যান্ডের একজন রেফারি অ্যাসেসর ও একজন সহকারী রেফারি সোমবার সাফ সচিবালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের ভিসার ব্যবস্থা করার বিষয়ে সহায়তা চেয়েছিলেন। প্রতিযোগিতা শুরুর এত কাছাকাছি সময়ে কর্মকর্তাদের ভিসা-সংক্রান্ত যোগাযোগের বিষয়টি আয়োজকদের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আয়োজনের এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশের লক্ষ্য ২৩ বছর পর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা পুনরুদ্ধার করা। ২০০৩ সালে সর্বশেষ এই প্রতিযোগিতার শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। এরপর একাধিক আসরে চেষ্টা করেও আর চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি দলটি।
তবে জাতীয় দলের প্রস্তুতি ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। টানা ছয় দিন জাতীয় দলকে সংবাদমাধ্যমের নাগালের বাইরে রাখা হয়েছিল। গতকাল পর্যন্ত সাংবাদিকেরা দলের সর্বশেষ অবস্থা ও প্রস্তুতির বিষয়ে নিয়মিত তথ্য পাননি।
বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের প্রত্যাশা নিয়ে তাবিথ বলেন, ২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে প্রতিবারই বাংলাদেশ শিরোপা জয়ের চেষ্টা করেছে। খেলোয়াড়েরা নিজেদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। এবার অবশ্য দলকে নিয়ে তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসী। তাঁর আশা, প্রথম ম্যাচ থেকেই খেলোয়াড়দের জয়ের মানসিকতা মাঠে দেখা যাবে।
প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজন না হওয়া নিয়েও কথা বলেছেন বাফুফে সভাপতি। ফিফার আন্তর্জাতিক ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের বাইরে অনুশীলন ম্যাচ আয়োজন করা কঠিন বলে স্বীকার করেন তিনি। তবে তাঁর মতে, ঘরোয়া লিগের তিন থেকে চারটি ম্যাচ খেলতে পারলেই দলের প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার চেয়ে দল হিসেবে একসঙ্গে খেলার সময় মাঠের পারফরম্যান্স বেশি গুরুত্বপূর্ণ। খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয় ও ম্যাচের পরিস্থিতিতে একসঙ্গে পারফর্ম করার ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে।
টিকিট বিক্রি নিয়েও সংশয় রয়েছে আয়োজকদের সামনে। উচ্চমূল্যের কারণে দর্শকদের মধ্যে টিকিট কেনার আগ্রহ প্রত্যাশার তুলনায় কম বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ৯৯৯ টাকা দামের টিকিট নিয়ে দর্শকদের আপত্তির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে তাবিথ আশা করছেন, প্রতিযোগিতা শুরু হলে দর্শক উপস্থিতি বাড়বে এবং বাংলাদেশ পূর্ণ গ্যালারির সামনে খেলতে পারবে।
সব মিলিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের উদ্বোধনের আগে মাঠের প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রচারণা, তথ্য সরবরাহ, সমন্বয় ও দর্শক সম্পৃক্ততা নিয়ে আয়োজকদের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রতিযোগিতা শুরু হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন বাফুফে সভাপতি। তবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ফুটবল আয়োজন হিসেবে পরিচিত এই প্রতিযোগিতার আগে রাজধানীতে প্রত্যাশিত উৎসবের আবহ তৈরি না হওয়ায় আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের
ইনস্টাগ্রাম
ভিজিট করুন।