জাতীয়

ভারত একবারও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা স্বীকার করে না

ভারত-বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে স্বতন্ত্র যুদ্ধ হিসেবে স্বীকার করে না বলে মন্তব্য করেছেন দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর ইন্সটিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে বাংলাদেশ সম্মেলন ২০২৬-এর প্রথম অধিবেশনে তিনি মন্তব্য করেন।

ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হলে আবেগ নয়, বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি দাবি করেন, কয়েকদিন আগে ভারতের পার্লামেন্টে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বক্তব্যেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে স্বতন্ত্র যুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বরং ভারতের দৃষ্টিতে এটি ছিল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, যেখানে পাকিস্তানকে বিভক্ত করার কৃতিত্ব ভারতকেই দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন,‘তারা একবারও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে না। এখান থেকেই বোঝা যায়, স্বাধীনতার শুরু থেকেই আমাদের বিদেশ নির্ভরতার একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বিদেশি শক্তির সহায়তা ছিল এটি ইতিহাসের অংশ। তবে অন্যান্য দেশের মতো সম্পূর্ণ নিজস্ব শক্তিতে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের হয়নি। উদাহরণ হিসেবে তিনি কিউবার কথা উল্লেখ করে বলেন, ফিদেল কাস্ত্রো বিদেশি সেনাবাহিনীর সহায়তা ছাড়াই দীর্ঘ লড়াইয়ের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের ক্ষেত্রেও হয়তো স্বাধীনতা অর্জনে আরও বেশি সময় লাগত, আরও বেশি রক্তক্ষয় হতো। কিন্তু ইতিহাসকে ইতিহাস হিসেবেই দেখতে হবে। এসব বাস্তবতা জানা এবং তা থেকে শিক্ষা নিয়েই আমাদের প্রকৃত জাতীয় পরিচয় নির্মাণ করতে হবে। পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের। তাই শুধু প্রবীণদের বক্তব্য নয়, তরুণদের মতামত ও অংশগ্রহণকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।’

বক্তব্যে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট হলো বাঙালি মুসলমানের পরিচয়গত (আইডেন্টিটি) সংকট। এর ঐতিহাসিক শিকড় অনুসন্ধান করতে হলে অন্তত দুই শতাব্দী, এমনকি এক হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা তথাকথিত ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ মূলত বাঙালি হিন্দু সমাজকেন্দ্রিক ছিল এবং মুসলমানদের সেখানে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় সমাজে একটি কৃত্রিম ‘বাঙালি বনাম মুসলমান’ বিভাজন তৈরি হয়েছে, যা আজও বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের পরিচয়কে ‘বাঙালি মুসলমান’ পরিচয়ের মধ্য দিয়ে আত্মস্থ করা গেলে এই কৃত্রিম দ্বৈততা দূর করা সম্ভব। ধর্মকে পরিচয়ের অংশ হিসেবে স্বীকার না করে জাতীয় পরিচয় নির্মাণ করা যাবে না। এই পরিচয়কে শক্তিশালী করতে গবেষণা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য একটি নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেল গড়ে তোলা প্রয়োজন। রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণে তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি মুসলিম দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। তবে উন্নয়নের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরকে অনুসরণের পরিবর্তে ভিয়েতনামকে বাস্তবসম্মত উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের সঙ্গে একটি সিটি-স্টেটের তুলনা যৌক্তিক নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হওয়া উচিত কৃষি ও উৎপাদনশীল শিল্পখাত। কৃষিতে কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এ খাতে সরকারি সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদনশীল শিল্পে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। ভিয়েতনামের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি অনেক, বাংলাদেশের উচিত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো।’

বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, ‘অতীত সরকারের উন্নয়ন ধারণা ছিল মূলত বড় বড় প্রকল্পনির্ভর এবং বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে তার যথেষ্ট সংযোগ ছিল না। বাস্তবতার ভিত্তিতে নতুন করে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।’

জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘এই আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ অব্যাহত থাকলে সেই চেতনা বাস্তবায়িত হবে না। মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই জুলাই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল এবং সে লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। তাই এই আন্দোলন ‘অসমাপ্ত’ ও ‘চলমান’।’

বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা মাবরুর রশিদ বান্নাহর বক্তব্যের একটি অংশের প্রসঙ্গ টেনে বলেন,’ পেলেট গুলির ব্যবহার ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে নয়, বরং তারও আগে শাপলা চত্বরের ঘটনাকাল থেকেই শুরু হয়েছিল। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই তৎকালীন সরকার ক্রমশ কঠোর অবস্থানে পৌঁছায়।’

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. সাইদুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শরিফুল আলম। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির এমেরিটাস প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের এমেরিটাস প্রফেসর ড. শাহজাহান খান ওএএম এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা মাবরুর রশিদ বান্নাহ।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel