নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচরে গড়ে ওঠে মানুষের বসতি। একসময় সেই বালুময় জমিতে সবুজ হয়ে ওঠে ফসলের খেত, তৈরি হয় জীবিকার নতুন পথ। কিন্তু বর্ষার প্রবল স্রোত আর নদীভাঙনে হারিয়ে যায় ঘরবাড়ি ও জমি। আজ যেখানে ঘর, কাল সেখানে নদীর পানি—এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেও থেমে থাকে না চরবাসীর জীবন। ভিটেমাটি হারিয়ে কেউ নতুন চরে ঘর বাঁধেন, কেউ আবার কৃষিকাজে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। আশা-নিরাশার এমন লড়াই উত্তরাঞ্চলের চরাঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ, ছিনাই ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়ন থেকে চিলমারী, উলিপুর ও যাত্রাপুরের চরাঞ্চল—নদীবক্ষে জেগে ওঠা এসব ভূমিতে গড়ে উঠেছে মানুষের বসতি। কোথাও ভুট্টা, মরিচ, বাদাম, ধান ও পেঁয়াজের আবাদ হচ্ছে, কোথাও গরু-ছাগল পালন ও দুগ্ধ খামারের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে জীবিকার নতুন সম্ভাবনা। তবে এসব সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নদীভাঙন, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও যোগাযোগের দুর্ভোগ।
রাজারহাট উপজেলার পাঁচটি চরের জনসংখ্যার চিত্রেও উঠে এসেছে চরাঞ্চলের বাস্তবতা। উপজেলা পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দে জনসংখ্যা ২ হাজার ৮২২ এবং চর তৈয়বখাঁয় ৭১২ জন। ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়ার চরে বসবাস করেন প্রায় ২ হাজার মানুষ। ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চর খিতাবখাঁয় প্রায় ৬০০ এবং চর গতিয়াশামে প্রায় ৭০০ মানুষের বসতি। এ হিসাবে পাঁচটি চরে মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৮৩৪। এসব চরের মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন কৃষি। কৃষিকাজ ও পশুপালন পরিবারের খাদ্যের জোগান দেওয়ার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। কোনো কোনো চরে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ সংযোগও পৌঁছেছে। তবে মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে।
চরগুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও নেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বিশুদ্ধ পানির নিরাপদ উৎস ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। কৃষি ও পশুপালনে সম্ভাবনা তৈরি হলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
চর বিদ্যানন্দের বাসিন্দা মনসুর আলীর জীবনেও রয়েছে আশা-নিরাশার এমন হিসাব। চরবাসীর প্রত্যাশা, নিরাপদ বসতি, বিশুদ্ধ পানি, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত হলে তাঁদের জীবন আরও স্বস্তির হবে। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ চান তাঁরা। উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য চরেও জীবনসংগ্রামের চিত্র প্রায় একই।
চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা মানুষমারা চরে বিভিন্ন এলাকার নদীভাঙনকবলিত প্রায় ৫০০ পরিবার বসতি গড়েছে। এ চরের সত্তরোর্ধ্ব কৃষক নজু মিয়ার উপলব্ধি, ‘এখানে আশা যেমন আছে, নিরাশাও আছে।’
নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও জমি হারানোর আশঙ্কা থাকলেও চর ছেড়ে সমতলে স্থায়ী হতে পারেননি তিনি। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের পোড়ার চরে বসবাস করছে প্রায় ৪০০ পরিবার। সেখানকার আশি বছর বয়সী ফজলু মুন্সীর জীবনে সাতবার চর বদলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। আরেক বাসিন্দা মোকছেদ আলী বলেন, কৃষক যেমন ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, চরবাসীর জীবনেও তেমনি অনিশ্চয়তা—এ বর্ষায় ঘর থাকলেও পরের বর্ষায় তা নাও থাকতে পারে।
তবে চরাঞ্চল এখন শুধু বালুচর নয়; অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছে কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন ক্ষেত্র। উলিপুর উপজেলার চর বেগমগঞ্জে রয়েছে বিদ্যুৎ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, দুগ্ধ খামার ও ছোট চালকল। সেখানকার কৃষকেরা ভুট্টা, মরিচ, বাদাম, তিল, গম, পেঁয়াজ, রসুন ও মিষ্টি আলুর মতো ফসল উৎপাদন করছেন। পশুপালন ও দুগ্ধ খামারও বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান প্রকৌশলী সরফরাজ বান্দার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম থেকে পাবনার ঢালারচর পর্যন্ত আট শতাধিক স্থানে চর জেগে উঠেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন গবেষণায় দেশে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষের চরে বসবাসের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের অধিকাংশই নদীভাঙনে গৃহহীন পরিবার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, দেশে চর রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০টি। এসব চরের ভূমির পরিমাণ প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর, যা দেশের মোট ভূমির প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২২ সালে চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট (সিডিএসপি) সংশ্লিষ্ট জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু মনে করেন, চর জরিপ বিচ্ছিন্নভাবে হওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিসংখ্যান, ভূমি অফিসের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। চরাঞ্চলের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পৃথক ‘চর মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
নদী রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও’ সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম হক্কানী। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর কার্যালয়ের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা অমূল্য রায়ের মতে, এ অঞ্চলের কৃষি নদীনির্ভর। নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে সেচব্যবস্থা ব্যাহত হয়। নদীভিত্তিক সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষার পাশাপাশি চরবাসীর জীবন-জীবিকার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সুত্রঃ যুগান্তর
📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের
ইনস্টাগ্রাম
ভিজিট করুন।