প্রযুক্তি

নতুন ‘মিউজ গ্লিমার’এআই মডেল উন্মুক্ত করল মেটা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নতুন একটি মডেল উন্মুক্ত করেছে মেটা প্ল্যাটফর্মস। ‘মিউজ গ্লিমার’ নামের এই মডেল কম্পিউটারে ডাউনলোড করে চালানো যাবে। ব্যবহারকারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী মডেলটি পরিবর্তনও করতে পারবেন। মেটার এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী এআই প্রযুক্তি কতটা উন্মুক্ত রাখা হবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান বিতর্ক আরো জোরালো হয়েছে। একদিকে কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এআইয়ের ওপর কঠোর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে। অন্যদিকে মেটার মতো প্রতিষ্ঠান মনে করে, শক্তিশালী এআই প্রযুক্তি আরো বেশি মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া উচিত।

মেটা সোমবার জানিয়েছে, ‘মিউজ গ্লিমার’ তাদের ‘মিউজ স্পার্ক ১.২’ মডেলের ছোট ও উন্নত সংস্করণ। কম কম্পিউটার ক্ষমতা, কম বিদ্যুৎ এবং সীমিত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করেও যাতে এটি চালানো যায়, সেভাবেই মডেলটি তৈরি করা হয়েছে। মেটার তথ্য অনুযায়ী, মিউজ গ্লিমারে ৩০ বিলিয়ন প্যারামিটার রয়েছে। এআই মডেল কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়, তার পেছনে এসব প্যারামিটার কাজ করে।
মডেলটি চালাতে একটি গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউই যথেষ্ট।

মিউজ গ্লিমার মূলত দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজের সহকারী হিসেবে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। সময়সূচি তৈরি ও পরিচালনা, ফাইল গোছানো এবং এ ধরনের অন্যান্য কাজ এটি করতে পারবে। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে একজন মানুষের ব্যক্তিগত সহকারীর মতো কাজ করার লক্ষ্যেই মডেলটি তৈরি করা হয়েছে। নতুন মডেল প্রকাশের পাশাপাশি মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ শব্দের একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন।

প্রবন্ধে জাকারবার্গ শক্তিশালী এআই প্রযুক্তিকে কোনো একটি কম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

তিনি বলেন, অতি শক্তিশালী এআই একটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত না করে মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। প্রত্যেক মানুষের নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী এই প্রযুক্তি ব্যবহার ও পরিচালনার সুযোগ থাকা দরকার। জাকারবার্গের মতে, এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত ক্ষমতায়নের নতুন একটি যুগ শুরু হতে পারে। মানুষ এআইয়ের শক্তি ব্যবহার করে নিজের সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারবে। তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ না করলেও এমন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করেছেন, যারা মূলত কম্পানি, সরকার বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য এআই তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

জাকারবার্গের এই অবস্থান এআই খাতের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নীতির সঙ্গে ভিন্ন। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী এআই মডেল নিয়ে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বেশি সতর্ক। এআই মডেল পরীক্ষার সময় নির্ধারিত পরিবেশের বাইরে চলে যাওয়ার কয়েকটি ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর উন্মুক্ত মডেল নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগও বেড়েছে। এর বিপরীতে জাকারবার্গ বলেছেন, মেটা এমন এআই তৈরি করছে, যা সবার জন্য ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারযোগ্য হবে। মেটার এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে চলমান বিতর্ককে আরো সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কম খরচে উন্মুক্ত এআই মডেল তৈরি করায় বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীনা প্রতিষ্ঠান মুনশট এআইয়ের কিমি কে৩-এর মতো মডেল দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এসব মডেল যুক্তরাষ্ট্রের বড় এআই কম্পানিগুলোর মালিকানাধীন মডেলের জন্য নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।

গুগলও স্থানীয় কম্পিউটারে চালানো যায় এমন উন্মুক্ত এআই মডেল তৈরি করছে। এর মধ্যে ‘জেমা’ পরিবারের মডেল রয়েছে। চীনের ডিপসিক, মুনশট এবং আলিবাবা গ্রুপও কম খরচের উন্মুক্ত মডেল তৈরি করছে। ফলে এআই ব্যবহারের জন্য অর্থ নেওয়া মার্কিন কম্পানিগুলোর ওপর প্রতিযোগিতার চাপ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতিনির্ধারক চীনের উন্মুক্ত এআই মডেলের ওপর বিধিনিষেধ দেওয়ার কথা বিবেচনা করেছেন। তবে প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন শীর্ষ নেতা এর বিরোধিতা করেছেন। তাদের মধ্যে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেনসেন হুয়াংও রয়েছেন। প্রযুক্তি খাতের এসব নেতার যুক্তি, দীর্ঘমেয়াদে এআই প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য উন্মুক্ত মডেল ভালো। তাদের মতে, এ ধরনের মডেল এআইয়ের নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী করতেও সাহায্য করতে পারে। জাকারবার্গও একই মত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিদেশি উন্মুক্ত উৎসের এআই মডেল ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করা কার্যকর সমাধান নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের উন্মুক্ত উৎসের মডেলগুলোকে বিশ্বের সেরা মডেলে পরিণত করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।

জাকারবার্গ বহু বছর ধরেই উন্মুক্ত এআই প্রযুক্তির পক্ষে কথা বলে আসছেন। মেটা এর আগে ‘লামা’ নামে একাধিক উন্মুক্ত এআই মডেল প্রকাশ করেছে। তবে এসব মডেল নিয়ে প্রযুক্তি খাতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। নতুন মিউজ গ্লিমারের মডেলকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা মূল মানগুলো হাগিং ফেস নামের একটি সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মে দেওয়া হবে। এগুলো বিনা মূল্যে ডাউনলোড করা যাবে। তবে মডেল চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং খরচ ব্যবহারকারীকেই বহন করতে হবে। মেটা আরো শক্তিশালী মিউজ স্পার্ক মডেলের একটি সংস্করণও উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে।

এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন উন্মুক্ত এআই মডেলের ওপর নতুন কোনো বড় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেনি। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা দেশটির বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানিয়েছেন, আপাতত উন্মুক্ত এআই মডেলগুলোকে সরকারের পরীক্ষার আওতায় আনা হবে না। চলতি মাসের শুরুতে চূড়ান্ত হওয়া নতুন এআই নিরাপত্তা কাঠামোর অধীনে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কাঠামোর আওতায় অত্যাধুনিক এআই মডেল বাজারে ছাড়ার আগে প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে স্বেচ্ছায় নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য মডেল জমা দিতে পারবে। এ জন্য তাদের ৩০ দিন সময় দেওয়া হবে। জাকারবার্গ অবশ্য এআই উন্নয়নে অতিরিক্ত কঠোর প্রক্রিয়া ও দীর্ঘ পর্যালোচনার ওপর নির্ভর না করার পরামর্শ দিয়েছেন। এর বদলে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরো ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো দ্রুত নতুন এআই মডেল বাজারে আনতে পারবে। এর ফলে এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ধরে রাখাও সহজ হবে।

এআই উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কম্পানিগুলো বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। মেটা, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট এবং মাইক্রোসফটসহ বিভিন্ন কোম্পানি এআই অবকাঠামো ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এই বিপুল ব্যয় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এত বড় বিনিয়োগের বিপরীতে কম্পানিগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা লাভ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত মাসে মেটা প্রথমবারের মতো মিউজ স্পার্ক ১.১ মডেল ব্যবহারের জন্য উন্নয়নকারীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া শুরু করে। মেটা অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের মতো একটি ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবসাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। এই ব্যবসার মাধ্যমে এআই মডেল এবং এআই চালানোর প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ক্ষমতা বিক্রি করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই ব্যবসা নিয়ে জাকারবার্গ এখনো বিস্তারিত কিছু জানাননি। এতে বিনিয়োগকারীদের কেউ কেউ হতাশ হয়েছেন। তাদের উদ্বেগ, বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে নতুন ব্যবসা থেকে মেটা কতটা আয় করতে পারবে।

এদিকে সোমবার মেটা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব এলাকায় তাদের তথ্যকেন্দ্র রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি নিজেই সেগুলো পরিচালনা করে, সেসব এলাকার জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করেছে। মেটা ও গুগলের মতো প্রযুক্তি কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় বড় তথ্যকেন্দ্র ও অবকাঠামো প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনা করেছে। তবে এসব প্রকল্প নিয়ে অনেক এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতা দেখা দিয়েছে। বিরোধিতাকারীদের অভিযোগ, বড় তথ্যকেন্দ্রগুলো বিপুল পরিমাণ জমি, বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করে। ফলে স্থানীয় পরিবেশ ও অবকাঠামোর ওপর এসব প্রকল্পের চাপ তৈরি হতে পারে।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel