রাজশাহী

রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু ১৫৮ মেয়ের বাবা মামুন বিশ্বাস

রক্তের সম্পর্ক নেই, নেই আত্মীয়তার বন্ধন। তবু সিরাজগঞ্জের ১৫৮টি পরিবারের কাছে মামুন বিশ্বাস পরিচিত এক আপনজন হিসেবে—অনেকের কাছে বাবার মতো অভিভাবক। অর্থাভাবে যেসব মেয়ের বিয়ে আটকে যায়, তাঁদের পাশে দাঁড়ান তিনি। মানুষের সহযোগিতা নিয়ে বিয়ের আয়োজন করেন, আর বিদায়বেলায় নববধূকে তুলে দেন নতুন পরিবারের হাতে।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার আগনুকালি গ্রামের স্কুলশিক্ষক মাহবুবুল হোসেনের ছেলে মামুন বিশ্বাসের বয়স ৩৮ বছর। সমাজকর্মী হিসেবে গত ১০ বছরে অর্থাভাবে বিয়ে দিতে না পারা ১৫৮ জন মেয়ের বিয়ের আয়োজনের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। বেনারসি শাড়ি, গয়না, বিয়ের মঞ্চ, আলোকসজ্জা, সাজসজ্জা ও অতিথিদের খাবার—বিভিন্ন আয়োজনের অর্থ জোগাড় করেছেন মানুষের সহযোগিতায়।

ফেসবুকের মাধ্যমে মানুষের পাশে

মামুনের এই উদ্যোগের বড় শক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। কোথাও কোনো অসহায় মেয়ের বিয়ে অর্থের অভাবে আটকে যাওয়ার খবর পেলে তিনি খোঁজখবর নেন। প্রয়োজন যাচাই করে ছবি ও ভিডিওসহ সহযোগিতার আবেদন জানান ফেসবুকে।

একজনের আহ্বানে সাড়া দেন দেশ-বিদেশের অনেক মানুষ। কেউ ১০০ টাকা, কেউ ৫০০ টাকা, আবার কেউ আরও বেশি অর্থ দিয়ে পাশে দাঁড়ান। সংগৃহীত অর্থে বিয়ের আয়োজন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকেন মামুন নিজেও।

আতিয়ার ভেঙে যাওয়া স্বপ্নে নতুন আশার আলো

কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের তেঘরি গ্রামের আতিয়া খাতুনের বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান। অর্থাভাবে আতিয়ার বিয়ের কার্ড ছাপানোর পরও দুবার বিয়ে ভেঙে যায়। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি।

আতিয়ার খবর পেয়ে ফেসবুকে সহযোগিতার আবেদন জানান মামুন। সাত দিনে প্রায় তিন লাখ টাকা সংগ্রহ হয়। গত ২৫ সেপ্টেম্বর আয়োজন করে আতিয়ার বিয়ে দেওয়া হয়।

আতিয়া বলেন, ‘দুইবার বিয়ে ভাঙার পর ভেবেছিলাম আমার আর বিয়ে হবে না। মামুন ভাই আমাকে বাবার মতো করে বিদায় দিয়েছেন।’

সুচিত্রার বিয়েতে সহায়তার পাশাপাশি মায়ের পাশে

একই উপজেলার জামতৈল গ্রামের সুচিত্রা রানী দাসের পরিবারের নিজস্ব জমি নেই। ভাড়া বাসায় থেকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁদের। অর্থাভাবে সুচিত্রার বিয়েও কয়েকবার ভেঙে যায়।

বিষয়টি জানার পর মামুন আবারও ফেসবুকে সহযোগিতার আবেদন জানান। পাঁচ দিনে সংগ্রহ হয় দুই লাখ ৩২ হাজার টাকা। গত ১ অক্টোবর পলাশ কুমার ভৌমিকের সঙ্গে সুচিত্রার বিয়ে হয়। পাশাপাশি সুচিত্রার মা কামনা রানী দাসের হাতে সংসার চালানোর সহায়তা হিসেবে ২১ হাজার টাকা তুলে দেন মামুন।

ছয়বার বিয়ে ভাঙার পর নন্দিনীর নতুন জীবন

উল্লাপাড়া উপজেলার বড়হর ইউনিয়নের ধুনচি গ্রামের নন্দিনী ছোটবেলায় বাবাকে হারান। তাঁর মা অন্যের বাড়িতে কাজ করার পাশাপাশি বাঁশের কুলা তৈরি করে বিক্রি করেন। প্রতিবেশীদের দেওয়া পুরোনো কাপড় পরে বড় হয়েছেন নন্দিনী ও তাঁর বোন।

নন্দিনীর বিয়ে ঠিক হওয়ার পর ছয়বারই তা ভেঙে যায়। একপর্যায়ে তিনি মাকে বলেছিলেন, ‘আমার আর বিয়ে লাগবে না মা।’

নন্দিনীর পরিস্থিতি জানতে পেরে সহযোগিতার উদ্যোগ নেন মামুন। তাঁর আবেদনে দুই লাখ ১২ হাজার টাকা সংগ্রহ হয়। সেই সহায়তায় বিয়ের আয়োজন করা হয় নন্দিনীর।

বিয়ের বাইরেও নানা মানবিক উদ্যোগ

মামুনের সমাজসেবামূলক কাজ শুধু বিয়ের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়। যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে অসহায় পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ, বন্যার সময় খাদ্যসহায়তা, গরু-ছাগল কিনে দিয়ে মানুষকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা এবং মুদি দোকান গড়ে দেওয়ার মতো কাজও করেছেন তিনি।

নিজ গ্রামে পাখির অভয়াশ্রম গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে শীতের অতিথি পাখিরা নিরাপদে থাকতে পারে। ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি বাক্‌প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণীদের বিয়ের আয়োজনেও সহযোগিতা করেছেন তিনি।

যেভাবে শুরু হয়েছিল পথচলা

স্থানীয় ইতিহাস গবেষক মোহাম্মদ আব্দুল হামিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে খুকনী গ্রামের একটি চায়ের দোকানে ফেরদৌস নামে এক প্রতিবন্ধী শিশুকে অন্য শিশুরা নির্যাতন করছিল। ঘটনাটি দেখে বিচলিত হন মামুন। ওই রাতেই ফেসবুকে প্রথমবারের মতো সহায়তার আবেদন জানান তিনি। সেখান থেকেই তাঁর সামাজিক কাজের সূচনা।

শুরুর দিকে অনেকে তাঁকে নিয়ে উপহাস করলেও বাবা মাহবুবুল হোসেন উৎসাহ দিয়েছিলেন। বাবার সেই সমর্থন তাঁকে কাজ চালিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় তাঁতী সমিতির সাবেক সভাপতি আব্দুস ছামাদ খান বলেন, ইচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে অসহায় মেয়েদেরও সুন্দরভাবে বিয়ে দেওয়া সম্ভব—মামুন তাঁর কাজের মাধ্যমে তা দেখিয়েছেন।

কৃতিত্ব দেন সহযোগীদের

এতগুলো বিয়ের আয়োজন করলেও নিজের কৃতিত্ব নিতে চান না মামুন বিশ্বাস। তাঁর ভাষ্য, এসব বিয়ের মূল কৃতিত্ব ফেসবুকের বন্ধু ও সহযোগীদের। তাঁরা অর্থ দিয়ে পাশে না দাঁড়ালে একার পক্ষে এত মানুষের দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব হতো না।

মামুন বলেন, মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও ৫০০ মেয়ের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি।

সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চল থেকে শহরের অলিগলি—অসহায় মানুষের খোঁজ পেলেই তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন মামুন। তাঁর উদ্যোগে বিয়ের আয়োজন পাওয়া পরিবারগুলোর কাছে এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; বরং নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে যে মানুষের আপনজন হয়ে ওঠা যায়, মামুন বিশ্বাসের কাজ তারই একটি উদাহরণ।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...