বিনোদন

কারাগারেই কাটছে ‘বাকের ভাই’ এর জন্মদিন

বাংলা নাটকের ইতিহাসে কিছু চরিত্র আছে, যেগুলো অভিনয়শিল্পীর পরিচয় ছাপিয়ে দর্শকের আবেগ ও স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। আসাদুজ্জামান নূরের জন্য ‘বাকের ভাই’ তেমনই এক চরিত্র।

হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিকে এই চরিত্রে অভিনয় করে যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, তা আজও অমলিন। ‘অয়োময়’-এর মীর্জা কিংবা ‘মাটির পিঞ্জির’-এর নান্দাইলের ইউনুস চরিত্রেও নিজের অভিনয়দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। তবে জীবনের ৮০তম জন্মদিনে নেই কোনো মঞ্চের আলো, সহকর্মীদের সঙ্গে উদ্‌যাপন কিংবা দর্শকের ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার সুযোগ। কারাগারেই কাটছে কিংবদন্তি এই অভিনেতার জন্মদিন।

আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) আসাদুজ্জামান নূরের ৮০তম জন্মদিন। ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তারের পর কারাগারে এটি তার তৃতীয় জন্মদিন। দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি রয়েছেন তিনি। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ও আইনি জটিলতার কারণে এখনো মুক্তি পাননি এই অভিনেতা।

জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন সহকর্মী, অনুরাগী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। এদিন নূরের পুত্রবধূ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজলী শেহরিন ইসলাম ২০২৪ সালে শ্বশুরের জন্মদিনে দেওয়া একটি পোস্ট আবারও শেয়ার করেছেন। সেখানে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি ন্যায়বিচার, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে নৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন তিনি।

কাজলী লিখেছেন, ‘শুভ ৮০তম জন্মদিন, বাবা। কারাগারে আপনার তৃতীয় জন্মদিনে আমাদের প্রত্যাশা, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে উঠুক, যেখানে ১৯৭১ সালের ন্যায়বিচার, জুলাইয়ের ন্যায়বিচার এবং আপনার জন্য ন্যায়বিচার চাওয়া যাবে এবং পাওয়া যাবে।

কারণ, এই বিচারগুলো একে অপরের বিরোধী নয়। বিচার হওয়া উচিত সবার জন্য সমান, সেখানে কোনো পক্ষপাত থাকবে না।’

একই পোস্টে তিনি আরো লিখেছেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সংস্কৃতিমনা হওয়া আর ধর্মবিশ্বাসী হওয়াকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখা হবে না। যেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে কেউ যেন ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে বা সঠিক কাজ করতে পিছপা না হন।’

কাজলীর এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর নূরের গ্রেপ্তারের পর দেওয়া তার আরেকটি আলোচিত পোস্ট। সে সময় তিনি বলেছিলেন, আসাদুজ্জামান নূরের রাজনৈতিক অবস্থান ও আওয়ামী লীগ সরকারের অংশ হিসেবে তার ভূমিকার সমালোচনা করার অধিকার সবার রয়েছে। তবে সেই সমালোচনার অর্থ এই নয় যে, প্রমাণ ছাড়া তাকে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত করা যাবে। নিরপেক্ষ আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত শ্বশুরের পাশে থাকার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

জুলাই আন্দোলনের প্রতি নিজের সমর্থন জানিয়ে কাজলী তখন বলেছিলেন, পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল, এখনো আছে। তবে সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা যেন ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কাউকে বঞ্চিত করার কারণ না হয়। দুই বছর পরও তার বক্তব্যে সেই একই ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা উঠে এসেছে।

১৯৪৬ সালের ৩১ অক্টোবর নীলফামারীতে জন্মগ্রহণ করেন আসাদুজ্জামান নূর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। পরে অভিনয় ও আবৃত্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে তাঁর সাংস্কৃতিক জীবন। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন মঞ্চে অভিনয় করেছেন তিনি।

মঞ্চে তার উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’ ও ‘গ্যালিলিও’। সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গি, কণ্ঠের নিয়ন্ত্রণ এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশের অসাধারণ ক্ষমতা তাকে মঞ্চের শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তবে টেলিভিশন নাটকই তাকে পৌঁছে দিয়েছে সাধারণ দর্শকের ঘরে ঘরে। হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিকের বাকের ভাই চরিত্রে অভিনয় করে অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পান তিনি। ১৯৯০ সালে প্রচারিত নাটকটির শেষ পর্ব ঘিরে দর্শকের আবেগ ও প্রতিবাদ সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। কাল্পনিক চরিত্র হয়েও বাকের ভাই যেন দর্শকের কাছে বাস্তবের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। আজও অনেকের কাছে আসাদুজ্জামান নূরের নামের আগে উচ্চারিত হয় ‘বাকের ভাই’।

‘অয়োময়’ নাটকে মীর্জা চরিত্রেও তার অভিনয় দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। এ ছাড়া ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’ ও ‘আজ রবিবার’-এর মতো জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। ‘মাটির পিঞ্জির’ নাটকে নান্দাইলের ইউনুস চরিত্রেও দর্শকের প্রশংসা পেয়েছেন এই অভিনেতা।

অভিনয়জীবনে কখনো নিজেকে নির্দিষ্ট কোনো ধরনের চরিত্রে সীমাবদ্ধ রাখেননি নূর। পরিবারের দায়িত্বশীল মানুষ থেকে শুরু করে বেকার যুবক, মাস্তান, চোর কিংবা ভাড়াটে খুনি—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি আবৃত্তিশিল্পী হিসেবেও রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য অবদান। শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা।

অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি। ২০০১ সালে নীলফামারী-২ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও একই আসন থেকে জয়ী হন। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগপর্যন্ত সংসদ সদস্য ছিলেন এই অভিনেতা।

২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর বেইলি রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন আসাদুজ্জামান নূর। জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলায় তাকে আসামি করা হয়। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনও মামলা করে। ২০২৫ সালে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে করা মামলাতেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

চলতি বছরের ১০ মে জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক দুটি হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পান তিনি। এর আগে মে মাসের শুরুতেও আরেকটি মামলায় জামিনের খবর আসে। তবে নীলফামারীর একটি হত্যা মামলাসহ অন্যান্য মামলার জটিলতায় তার মুক্তি মেলেনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলাতেও জামিন পাননি তিনি। ফলে এক মামলায় জামিন পাওয়ার পরও অন্য মামলায় কারাগারে থাকতে হচ্ছে তাকে।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...