রংপুর বিভাগ

আমনের ফলন ভালো, তবু উৎপাদন খরচ বেড়ে দুশ্চিন্তায় রংপুরের কৃষকরা

অনুকূল আবহাওয়া, পরিশ্রম ও সঠিক পরিচর্যায় রংপুর অঞ্চলে আগাম জাতের আমন ধানের ভালো ফলন হয়েছে। পাকা ধান কাটতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। তবে ফলন সন্তোষজনক হলেও সার, শ্রমিকসহ উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভের অঙ্ক নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁরা। ধান কাটার পর একই জমিতে আলু, ভুট্টা ও শীতকালীন শাকসবজি চাষের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন অনেকে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুর এলাকায় সরেজমিনে ধান কাটার এমন চিত্র দেখা গেছে।

কৃষকদের ভাষ্য, আগাম জাতের আমন তুলনামূলক কম সময়ে ঘরে তোলা যায়। এ জাতের ধানে রোগবালাইও কম দেখা দেওয়ায় ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি আগাম ধান কাটার পর একই জমিতে রবিশস্য আবাদ করে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।

রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর সদর উপজেলায় ২০৫ হেক্টর, কাউনিয়ায় ২২৫ হেক্টর, মিঠাপুকুরে ২ হেক্টর এবং মহানগর এলাকায় ৩ হেক্টরসহ মোট ৪৩৫ হেক্টর জমির আগাম আমন ধান কাটা হয়েছে। আগাম জাতের ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন হয়েছে ৩ দশমিক ১৫ টন।

রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুর গ্রামের কৃষক রহমত আলী বাসসকে বলেন, আগাম ধান কাটার পর জমিতে আলু এবং পরে ভুট্টা চাষ করবেন তিনি। তাঁর হিসাবে, প্রতি দোনে (বিঘা) ১২ থেকে ১৫ মণ ধান হয়েছে। প্রতি মণ ধান ৬২০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। ধান বিক্রির টাকা দিয়ে পরিবারের খরচ চালানোর আশা করছেন তিনি।

তবে উৎপাদন খরচ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন কৃষক সবুজ মিয়া। তিনি বলেন, সার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এ অবস্থায় ধানের দাম আরও কিছুটা বাড়লে কৃষকেরা ভালোভাবে সংসার চালাতে পারতেন।

রংপুরের মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক শফিয়ার রহমান পাঁচ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। এর মধ্যে তিন বিঘা জমি থেকে ৪৭ মণ ধান পেয়েছেন। বাকি দুই বিঘার ধান এক সপ্তাহের মধ্যে কাটার আশা করছেন তিনি।

শফিয়ার রহমান জানান, সাধারণত উঁচু জমিতে আগাম জাতের আমন চাষ করা হয়, যেখানে পানি জমে থাকে না। এ জাতের ধানের ফলন সাধারণ আমনের তুলনায় বিঘাপ্রতি ২ থেকে ৩ মণ কম হয়। তাঁর হিসাবে, বিঘাপ্রতি উৎপাদন হয় ১৬ থেকে ১৮ মণ। এবার প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৪ হাজার টাকা, যা গত বছর ছিল ১২ হাজার টাকা।

ধান কাটার পর আগাম জাতের ফুলকপি, গাজর, বেগুন ও ধনিয়াপাতা চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। শীতকালীন সবজি তোলার পর জমিতে বোরো ধান আবাদ করবেন বলেও জানান।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট গ্রামের কৃষক আদিলুর রহমান ছয় বিঘা জমিতে আগাম আমন চাষ করেছেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছে ৮৭ হাজার টাকা। গত বছর একই পরিমাণ জমিতে খরচ হয়েছিল ৭১ হাজার টাকা। তিনি জানান, এলাকায় অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আগাম আমন ধান কাটা চলে। এবার ফলন ভালো হলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তিনি হতাশ।

কালীগঞ্জের কাকিনা চর রুদ্রেশ্বর এলাকার কৃষক হোসেন আলী জানান, তাঁদের এলাকায় চলতি সপ্তাহ থেকে আগাম আমন কাটা শুরু হয়েছে। এ বছর রোগবালাই কম থাকায় আশানুরূপ ফলন পেয়েছেন তিনি। তিন বিঘা জমি থেকে ৫২ মণ ধান পেয়েছেন। এখন ওই জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করছেন। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ কমেছে বলে জানান তিনি।

হাতীবান্ধার চর গড্ডিমারা এলাকার কৃষক রওশন আলম বলেন, এ বছর এলাকায় বন্যা না হওয়ায় আগাম আমনের তেমন ক্ষতি হয়নি। ধান কাটার পর শীতকালীন ফসল চাষের সুবিধার জন্য তাঁরা আগাম জাতের আমন আবাদ করেন। তাঁর চার বিঘা জমির ধান পেকে গেছে। দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে কাটার কাজ শুরু করবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা—কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে মোট ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে ২০ লাখ ১ হাজার ৩৯১ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের আমন চাষ হয়েছে ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন, উঁচু জমিতে চাষ করা আগাম জাতের আমন ধান ইতোমধ্যে কাটা শুরু হয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ ধান কাটার মৌসুম চলে। নভেম্বরের শুরুতে মৌসুমের অন্যান্য আমন ধান কাটা শুরু হবে। এ বছর বন্যার প্রভাব কম থাকায় আগাম আমনের উৎপাদন আশানুরূপ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আগাম আমন কাটার পর কৃষকেরা ভুট্টা, আগাম আলু ও বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন শাকসবজি চাষ করেন।

রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মাহমুদা খাতুন বলেন, এ বছর জেলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩৫ হেক্টর জমির আগাম আমন কাটা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি এ ধানের ফলন হয়েছে ৩ দশমিক ১৫ টন। আগাম আমন কাটার পর রবিশস্য আবাদ করে ধান ও পরবর্তী ফসল—দুই ক্ষেত্রেই ভালো দাম পাওয়ার আশায় রয়েছেন কৃষকেরা। গত বছরের মতো এবারও ফলন ভালো হয়েছে বলে জানান তিনি।

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...