রংপুর বিভাগ

ঠাকুরগাঁওয়ে কৃষকের ৮৫ টাকার শিম, বাজারে ১৪০

ঠাকুরগাঁওয়ে আগাম শিমের আবাদ করে মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পেলেও সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমতে শুরু করেছে। মৌসুমের শুরুতে কোনো কোনো কৃষক প্রতি কেজি শিম ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। বর্তমানে কৃষকেরা খেত থেকে শিম বিক্রি করছেন ৮৫ টাকা কেজি দরে। অথচ পাইকারি আড়তে সেই শিমের দাম উঠছে ১১০ টাকা এবং ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি বাজারে ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি দরে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়ন ও পীরগঞ্জ উপজেলার খনগাঁও ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এখন আগাম শিমের আবাদ হচ্ছে। গত রোববার সকালে সদর উপজেলার বালিয়াখুড়ি ও পীরগঞ্জের চানগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শিমখেতগুলো বেগুনি ফুলে ছেয়ে আছে। ফুলের ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে কচি শিম। কোনো কোনো কৃষক খেত থেকে শিম তুলছেন, আবার কেউ মাচা ঠিক করা ও খেতের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।

কৃষকদের ভাষ্য, অন্য অনেক ফসলের তুলনায় শিম চাষে খরচ কম এবং তুলনামূলক দ্রুত ফলন পাওয়া যায়। তাই মৌসুমের শুরুতে আগাম শিম বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ থাকে। তবে একসঙ্গে অনেক কৃষকের শিম বাজারে উঠলে সরবরাহ বেড়ে যায় এবং দ্রুত দাম কমে আসে। ফলে আগাম শিম চাষে লাভের সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি উৎপাদন ও বাজারদরের অনিশ্চয়তাও আছে।

সদর উপজেলার বালিয়াখুড়ি গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন ২৫ শতক জমিতে শিম চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত চার দফায় শিম তুলে বিক্রি করেছেন তিনি। প্রথম দফায় ১০ কেজি শিম প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে বিক্রি করেন। দ্বিতীয় দফায় ১৮ কেজি বিক্রি করেন ১২০ টাকা কেজি দরে এবং তৃতীয় দফায় ৩০ কেজি বিক্রি করেন ১০০ টাকা দরে। সর্বশেষ ১০০ কেজি শিম বিক্রি করেছেন ৮৫ টাকা কেজি দরে। চার দফায় তাঁর মোট বিক্রি হয়েছে ১৫ হাজার টাকার শিম।

দেলোয়ার হোসেন জানান, ২৫ শতক জমিতে শিম চাষ করতে বীজ, সার, কীটনাশক ও মাচা তৈরিতে তাঁর ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। খেতে এখনো অনেক শিম রয়েছে। দাম ভালো থাকলে উৎপাদন খরচ তুলে লাভ করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

পীরগঞ্জ উপজেলার চানগাঁও গ্রামের কৃষক হামিদুল ইসলাম (৪৮) এবার ৩৩ শতক জমিতে শিম চাষ করেছেন। ইতিমধ্যে দুই মণ শিম বিক্রি করেছেন তিনি। মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি শিম ১৪০ টাকা দরে বিক্রি করলেও গত শনিবার বিক্রি করেছেন ৯০ টাকা কেজি দরে। হামিদুল বলেন, মৌসুমের শুরুতে দাম ভালো থাকে বলেই তিনি আগাম শিম চাষ করেন।

একই উপজেলার শিমুলপুর গ্রামের সাদেকুল ইসলাম (৩৫) ছয় বছর ধরে ২৫ শতক জমিতে আগাম শিম চাষ করছেন। এবার তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার টাকা। এরই মধ্যে দুই দফায় এক মণ শিম বিক্রি করেছেন তিনি। গত বছর একই জমি থেকে প্রায় ৯০ মণ শিম পেয়েছিলেন। শুরুতে প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলেও পরে দাম দ্রুত কমে যায়। একপর্যায়ে প্রতি কেজি শিম মাত্র ১০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছিল বলে জানান সাদেকুল।

বালিয়াখুড়ি গ্রামের কৃষক পরিমল রায় (৫৮) এবার ৫০ শতক জমিতে আগাম শিমের চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত দুই মণ শিম বিক্রি করেছেন তিনি। দুই দিন আগে ৫৫ কেজি শিম প্রতি কেজি ১১০ টাকা দরে বিক্রি করেন। আর গত শনিবার সকালে ২৫ কেজি বিক্রি করেন ৮৫ টাকা কেজি দরে।

পরিমল রায়ের পাশের ১৫ শতক জমিতে গত ১০ বছর ধরে আগাম শিম চাষ করছেন চানগাঁও গ্রামের আশরাফুল ইসলাম (৫৫)। এবার তাঁর উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাকা। এরই মধ্যে প্রায় ১০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছেন তিনি।

তবে আগাম শিম চাষে আবহাওয়া ও পোকামাকড়ের ঝুঁকিও রয়েছে। চানগাঁও গ্রামের কৃষক শরিফুল ইসলাম (৬২) বলেন, অতিবৃষ্টি, অসময়ের বৃষ্টি ও তীব্র গরমে শিমগাছের ফুল ঝরে যায়। কখনো গাছের শিকড় পচে যায়। এ ছাড়া ফল ছিদ্রকারী পোকা ও জাব পোকার আক্রমণে গাছের ক্ষতি হয়। জাব পোকা পাতা, কাণ্ড, ফুল ও কচি ফলের রস চুষে খায়। এসব সমস্যা দেখা দিলে বাড়তি বালাইনাশক ব্যবহার করতে হয়। আবহাওয়া প্রতিকূল হলে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়।

খেত থেকে ভোক্তার থালা পর্যন্ত পৌঁছাতে শিমের দামে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে কৃষকের কাছ থেকে পাইকাররা প্রতি কেজি শিম কিনছেন ৮৫ টাকায়। পরে আড়তে বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা কেজি দরে। আর ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি বাজারে ভোক্তাদের একই শিম কিনতে হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি দরে।

খেত থেকে আড়তে শিম সরবরাহ করেন পীরগঞ্জের লোহাগাড়া গ্রামের জহিরুল ইসলাম (৩৭)। তিনি বলেন, খেত থেকে শিম কেনার পর সেগুলো বাছাই করতে হয়। এ সময় কিছু শিম বাদ পড়ে যায়। এরপর শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ যোগ হয়। এসব ব্যয় হিসাব করেই আড়তে বিক্রির দাম নির্ধারণ করতে হয়।

ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে গত বছর জেলায় ৫৪৫ হেক্টর জমিতে আগাম শিমের আবাদ হয়েছিল। উৎপাদিত শিম জেলার চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি ও পরিবেশ সবজি চাষের জন্য উপযোগী। এ কারণে আগাম শিমসহ শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহ রয়েছে। সাধারণত মার্চ-এপ্রিলে আগাম শিমের বীজ বপন করা হয়। মে-জুন মাসেও বীজ বপন করা হয়। কৃষকদের মানসম্মত বীজ সরবরাহের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

মাজেদুল ইসলাম আরও বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় শিমের আবাদ ভালো হয়েছে। তবে বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসে। এ কারণে কৃষকদের উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখতে হবে।

সুত্রঃ প্রথম আলোর

📷 ইনস্টাগ্রাম নোটিশ:
সার্ভারে জায়গা স্বল্পতার কারণে ছবি সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ছবি পেতে আমাদের ইনস্টাগ্রাম ভিজিট করুন।

এই বিভাগের আরো খবর
❮
Follow Us
Facebook Page Facebook Group WhatsApp Channel
✖
আমাদের সাথে Facebook-এ থাকুন
Facebook Page লোড হচ্ছে...